নতুন পে-স্কেলের জোরালো দাবি: জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অসঙ্গতিতে দিশেহারা সরকারি কর্মচারীরা
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল ঘোষণার দাবি বর্তমানে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর প্রায় এক দশক পার হতে চললেও নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ স্কেল ঘোষণা না হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে এই ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি।
কেন নতুন পে-স্কেল এখন সময়ের দাবি? বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের পর দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন স্কেলের প্রয়োজনীয়তার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক কারণ উঠে এসেছে: ১. লাগামহীন মূল্যস্ফীতি: গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের দাম এখন আকাশচুম্বী। নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালানো সাধারণ কর্মচারীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২. জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়: শহর অঞ্চলে বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ এবং সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় যে হারে বেড়েছে, বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ৩. গ্রেড বৈষম্য: বর্তমান বেতন কাঠামোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নিম্ন পদের কর্মচারীদের মধ্যে বেতনের যে বিশাল ব্যবধান, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। কর্মচারীরা অভিযোগ করছেন যে, এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির পার্থক্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে হাজার হাজার টাকা হলেও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র কয়েকশ টাকা।
কী থাকছে সম্ভাব্য নবম পে-স্কেলে? যদিও সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঘোষণা করেনি, তবে বিভিন্ন সূত্র ও কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী সম্ভাব্য সংস্কারগুলো হতে পারে:
মূল বেতন বৃদ্ধি: বাজার দরের সঙ্গে সংগতি রেখে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা।
ভাতা পুনর্নির্ধারণ: বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং টিফিন ভাতা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাড়ানো।
গ্রেড পুনর্বিন্যাস: ২০টি গ্রেডের পরিবর্তে ১০টি বা তার কম গ্রেড প্রবর্তন করে বৈষম্য কমিয়ে আনা।
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড: বাতিল হওয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনরায় চালুর দাবি জানানো হচ্ছে যাতে পদোন্নতি না পেলেও কর্মচারীরা আর্থিক সুবিধা পান।
সরকারের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান অবস্থা সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা মানেই বাজেটে এক বিশাল অংকের বাড়তি চাপ। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ডলার সংকটের কারণে সরকারের ওপর এমনিতেই ব্যয়ের চাপ রয়েছে। তাছাড়া নতুন স্কেল ঘোষণা করা হলে বাজারে এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ‘মহার্ঘ ভাতা’ প্রদান করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। তারা মনে করেন, একটি বৈষম্যহীন এবং আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে হলে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
উপসংহার সব মিলিয়ে নবম পে-স্কেল এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা নাকি আরও দীর্ঘসূত্রিতার কবলে পড়বে, তা নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে সাধারণ কর্মচারীরা আশা করছেন, সরকার তাদের জীবনযাত্রার কষ্ট লাঘবে দ্রুত একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


