৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নিম্ন গ্রেডে মাত্র ৬ হাজার টাকার ব্যবধান, উচ্চ গ্রেডে এক ধাপে ১২-১৫ হাজার—প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ ও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, ১১ থেকে ২০ গ্রেড পর্যন্ত দীর্ঘ ১০টি গ্রেডে মোট বেতন ব্যবধান যেখানে মাত্র প্রায় ৬ হাজার টাকা, সেখানে ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে এক ধাপেই ব্যবধান প্রায় ১২ হাজার টাকা। আবার ৯ম থেকে ৮ম গ্রেডে ব্যবধান তুলনামূলক কম হলেও পরবর্তী বিভিন্ন উচ্চ গ্রেডে এক ধাপে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরিতে একই বেতন কাঠামোর মধ্যে গ্রেডভিত্তিক ব্যবধান নির্ধারণে কি নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রত্যাশা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে?

১১ থেকে ২০ গ্রেডে দীর্ঘ ব্যবধান, কিন্তু আর্থিক পার্থক্য সীমিত

কর্মচারীদের অভিযোগের মূল জায়গাটি হলো নিম্ন গ্রেডের বেতন ব্যবধান। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মোট ১০টি গ্রেড রয়েছে। কিন্তু এই ১০টি গ্রেড অতিক্রম করেও মূল বেতনের ব্যবধান মাত্র প্রায় ৬ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে।

অর্থাৎ, সর্বনিম্ন স্তরের কর্মচারী থেকে তুলনামূলক উচ্চতর ১১তম গ্রেড পর্যন্ত পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও যোগ্যতার পার্থক্য থাকলেও বেতনের ব্যবধান খুব বেশি নয়।

এ নিয়ে কর্মচারীদের প্রশ্ন, ১০টি গ্রেডের মধ্যে মোট ব্যবধান যদি মাত্র ৬ হাজার টাকা হয়, তাহলে প্রতিটি গ্রেডের স্বতন্ত্রতা ও পদভেদে আর্থিক মূল্যায়ন কোথায়?

তাদের মতে, গ্রেডের সংখ্যা বাড়লেও যদি বেতন ব্যবধান আনুপাতিকভাবে না বাড়ে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার আর্থিক আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

১০ম থেকে ৯ম গ্রেডে একলাফে ১২ হাজার টাকার অভিযোগ

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ১০ম ও ৯ম গ্রেডের মধ্যকার ব্যবধান। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে উন্নীত হলে বেতনের ব্যবধান একলাফে প্রায় ১২ হাজার টাকা

অন্যদিকে, এর নিচের গ্রেডগুলোতে একাধিক ধাপ পার হওয়ার পরও যে পরিমাণ ব্যবধান তৈরি হচ্ছে না, একটি মাত্র গ্রেড পরিবর্তনেই তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যবধান দেখা যাচ্ছে বলে কর্মচারীদের দাবি।

এ কারণে নিম্ন গ্রেডের প্রতিনিধিরা বলছেন, বেতন কাঠামোতে ‘গ্রেড কম, ব্যবধান কম—গ্রেড উচ্চ, ব্যবধান বেশি’ ধরনের একটি অসম চিত্র তৈরি হয়েছে।

তাদের প্রশ্ন, একই জাতীয় বেতন কাঠামোর মধ্যে গ্রেডভেদে ব্যবধান এত বেশি হওয়ার যৌক্তিকতা কী?

৯ম থেকে ৮ম গ্রেডে মাত্র ২ হাজার, এরপর আবার বড় লাফ

আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে গ্রেডগুলোর মধ্যে ব্যবধানের ধারাবাহিকতা নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৯ম থেকে ৮ম গ্রেডে ব্যবধান প্রায় ২ হাজার টাকা। কিন্তু এরপরের বিভিন্ন উচ্চ গ্রেডে আবার এক ধাপে ১২ হাজার থেকে ১৪-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

ফলে পুরো বেতন কাঠামোতে একটি সমানুপাতিক বা ধাপে ধাপে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবধান নেই বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, একটি আদর্শ গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোতে সাধারণত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

১. প্রতিটি গ্রেডের মধ্যে একটি যৌক্তিক আর্থিক পার্থক্য থাকতে হবে।
২. নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাস্তব আয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. গ্রেডের ব্যবধান এমন হতে হবে, যাতে কোনো একটি ধাপে অস্বাভাবিক লাফ বা সংকোচন না ঘটে।

কিন্তু প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে যে হিসাব সামনে এসেছে, সেখানে এই ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

নিম্ন গ্রেডের ব্যবধান ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা করার দাবি ছিল

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরেই গ্রেডভিত্তিক বেতন ব্যবধান বাড়ানোর দাবি করে আসছিলেন। তাদের অন্যতম দাবি ছিল, নিম্ন গ্রেডগুলোতে প্রতিটি ধাপের ব্যবধান ১ হাজার, ১ হাজার ৫০০ কিংবা ২ হাজার টাকা পর্যায়ে নির্ধারণ করা হোক।

তাদের যুক্তি ছিল, বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন বেতনের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ তুলনামূলক বেশি।

তাই নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু সর্বনিম্ন বেতন বাড়ালেই হবে না, গ্রেড থেকে গ্রেডে ওঠার আর্থিক ব্যবধানও যৌক্তিকভাবে বাড়াতে হবে

কিন্তু কর্মচারীদের অভিযোগ, তাদের এই দাবির পূর্ণ প্রতিফলন প্রস্তাবিত কাঠামোতে দেখা যাচ্ছে না।

কেন এই ব্যবধানকে বৈষম্য বলছেন কর্মচারীরা?

‘বৈষম্য’ শব্দটি এখানে মূলত ব্যবহার করা হচ্ছে বেতন বৃদ্ধির বণ্টনগত ভারসাম্যহীনতা বোঝাতে।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বক্তব্য, নতুন বেতন কাঠামো তৈরির সময় যদি মোট আর্থিক সুবিধার বড় অংশ উচ্চ গ্রেডের ব্যবধান বাড়াতে ব্যয় করা হয় এবং নিম্ন গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান খুব সীমিত রাখা হয়, তাহলে সেটি কাঠামোগত বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে।

তাদের ভাষ্য, একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী কয়েকটি গ্রেডের ব্যবধান অতিক্রম করেও যে আর্থিক পার্থক্য পান না, উচ্চ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা কখনো কখনো এক ধাপেই তার চেয়ে বেশি ব্যবধান পেয়ে যান।

এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক।

পদমর্যাদা অনুযায়ী ব্যবধান থাকবে, তবে কতটা?

তবে বেতন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে গ্রেডভেদে সমান ব্যবধান সব সময় বাস্তবসম্মত নয়। কারণ উচ্চতর পদে দায়িত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিধি এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।

ফলে উচ্চ গ্রেডে বেতন বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্চ গ্রেডের বেতন বেশি হওয়া এবং গ্রেডগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের দাবি, উচ্চ গ্রেডের সুবিধা কমানো তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং তাদের দাবি হলো—নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন ও গ্রেড ব্যবধান এমন পর্যায়ে উন্নীত করা হোক, যাতে পুরো কাঠামোটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি নিম্ন আয়ের কর্মীদের ওপর

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় খাদ্য, বাসা ভাড়া, যাতায়াত ও সন্তানের শিক্ষায়।

একই বাজারে একজন উচ্চ ও একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীকেই প্রায় একই দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয়। ফলে বেতন বৃদ্ধির শতাংশ বা টাকার অঙ্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের কর্মীদের প্রয়োজনকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

কর্মচারীদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো

শুধু বেতনের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ালেই একটি বেতন কাঠামোকে জনবান্ধব বা কর্মচারীবান্ধব বলা যায় না; দেখতে হবে সর্বনিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীরা বাস্তবে কতটা সুবিধা পাচ্ছেন।

পুনর্বিবেচনার দাবি

এ পরিস্থিতিতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক ব্যবধান পুনর্বিবেচনার দাবি উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তাদের দাবি হতে পারে—

  • ১১ থেকে ২০ গ্রেডের মধ্যে বেতন ব্যবধান আরও যৌক্তিকভাবে বাড়ানো;
  • প্রতিটি নিম্ন গ্রেডে ন্যূনতম একটি নির্ধারিত আর্থিক ব্যবধান রাখা;
  • গ্রেডের ব্যবধান নির্ধারণে ১ হাজার, ১ হাজার ৫০০ ও ২ হাজার টাকার ধাপ বিবেচনা করা;
  • ১০ম থেকে ৯ম গ্রেডে হঠাৎ বড় ব্যবধানের কারণ পর্যালোচনা করা;
  • পুরো বেতন কাঠামোয় একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক অনুপাত নিশ্চিত করা।

কর্মচারীদের প্রশ্ন—দাবি ছিল এক, বাস্তবায়ন হলো কী?

সব মিলিয়ে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—“আমরা যে গ্রেড ব্যবধান ১ হাজার, ১ হাজার ৫০০ কিংবা ২ হাজার টাকা করার দাবি করেছিলাম, সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন কোথায়?”

তাদের মতে, নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অঙ্ক দেখলে হবে না। দেখতে হবে ২০ থেকে ১১, ১১ থেকে ১০, ১০ থেকে ৯ এবং এরপরের প্রতিটি গ্রেডে বেতন ব্যবধান কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কারণ একটি জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে শুধু বেতন বৃদ্ধির ওপর নয়, বরং বেতন বৃদ্ধির ন্যায্য বণ্টন, গ্রেডভিত্তিক ভারসাম্য এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বাস্তব জীবনমানের উন্নতির ওপর।

প্রস্তাবিত কাঠামোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তাই নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের দাবিগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রেডভিত্তিক বেতনসংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদিত সরকারি গেজেট প্রকাশের পরই প্রকৃত ব্যবধানের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল চিত্র নিশ্চিতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *