মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা শিক্ষিকা কি সন্তানের চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে পারবেন? কী বলছে বিধান ও প্রশাসনিক নজির
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা বর্তমানে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন। এ অবস্থায় তার নবজাতক সন্তানের জরুরি চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি কীভাবে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি নিতে পারবেন—এ প্রশ্ন নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
প্রশাসনিক বিধান, সরকারি চাকরি সংক্রান্ত নিয়মাবলি এবং সাম্প্রতিক প্রশাসনিক নজির বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ করা আবশ্যক।
মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বিদেশ যাত্রার সুযোগ আছে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাতৃত্বকালীন ছুটি মূলত বেতনসহ একটি অনুমোদিত ছুটি। এ সময় কর্মচারী কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতায় থাকেন না। ফলে জরুরি পারিবারিক বা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে তা অবশ্যই সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষে হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সন্তানের চিকিৎসা জরুরি হয়, তাহলে শিক্ষিকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি নিতে পারেন। অনুমোদন পাওয়ার পর তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির অবশিষ্ট সময়ের মধ্যেই বিদেশ সফর সম্পন্ন করতে পারবেন।
বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নেওয়া কি বাধ্যতামূলক?
এ বিষয়ে প্রশাসনিক মহলে দুটি মতামত দেখা যায়।
প্রথম মত অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি চলমান থাকলে আলাদা করে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি গ্রহণের প্রয়োজন নাও হতে পারে। কেবল বিদেশ গমনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি (Permission) গ্রহণ করলেই চলতে পারে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় মত হলো, বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন গ্রহণ করাই অধিকতর নিরাপদ ও বিধিসম্মত পদ্ধতি। কারণ বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড সরকারি নথিতে সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানো যায়।
প্রশাসনিক নজির কী বলছে?
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে মাতৃত্বকালীন ছুটির অবশিষ্ট সময়ে পারিবারিক প্রয়োজনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়কালেই বিদেশ সফরের অনুমতি পান এবং স্থানীয় মুদ্রায় বেতন-ভাতা গ্রহণসহ নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করা হয়।
এ নজির থেকে বোঝা যায় যে, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা কোনো সরকারি কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করতে পারেন।
অর্জিত ছুটি কর্তন হবে কি?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে। যদি মাতৃত্বকালীন ছুটির মধ্যেই কেবল বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রকৃতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সাধারণভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি বলবৎ থাকবে।
তবে যদি আলাদাভাবে বহিঃবাংলাদেশ ছুটি বা অন্য কোনো ধরনের ছুটি মঞ্জুর করা হয়, সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী অর্জিত ছুটি (Earned Leave) থেকে কর্তন এবং বেতন-ভাতার বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপ অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন—
- সন্তানের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় মেডিকেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করা।
- বিদেশে চিকিৎসার কারণ উল্লেখ করে আবেদন করা।
- পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত তথ্য সংযুক্ত করা।
- সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণ করা।
- অনুমোদনপত্র হাতে পাওয়ার পর ভ্রমণ করা।
উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষিকা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থায় সন্তানের জরুরি চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে পারবেন। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিদেশ গমনের অনুমতি গ্রহণ করাই প্রধান শর্ত, আর প্রয়োজন হলে বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও নিতে হতে পারে। তাই বিদেশ যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি সংগ্রহ করাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ ও বিধিসম্মত ব্যবস্থা।



