আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

রিটার্ন জমার সময় যে পাঁচ ভুল এড়িয়ে চলবেন

দেশে করদাতার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে দেশে সোয়া এক কোটির বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেন প্রায় ৫০ লাখ করদাতা। এবার অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও করদাতার জন্য পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে কর কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন করদাতা। তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সম্পদ, বিনিয়োগ, উপহার, নগদ অর্থ ও ব্যয়ের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সাধারণত যে পাঁচটি ভুল এড়িয়ে চলা উচিত, সেগুলো হলো—

১. প্রকৃত পরিমাণের চেয়ে বেশি সোনার গয়না দেখানো

অনেক করদাতা রিটার্নে বাস্তবে থাকা সোনার গয়নার চেয়ে বেশি পরিমাণ উল্লেখ করেন। কিন্তু এভাবে সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানো ভবিষ্যতে প্রশ্নের কারণ হতে পারে।

একজন করদাতার আয় ও সম্পদের মধ্যে স্বাভাবিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। আয় যদি তুলনামূলকভাবে কম হয় অথচ রিটার্নে বিপুল পরিমাণ সোনার গয়না দেখানো হয়, তাহলে সেই সম্পদের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।

তাই রিটার্নে প্রকৃতপক্ষে যতটুকু সোনার গয়না রয়েছে, যথাযথভাবে সেটিই উল্লেখ করা উচিত।

২. আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য রেখে অতিরিক্ত নগদ দেখানো

রিটার্নে হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অনেক সময় করদাতারা বাস্তবে থাকা অর্থের তুলনায় বেশি নগদ সম্পদ দেখিয়ে থাকেন।

কিন্তু আয়, ব্যয় ও নগদ অর্থের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে সেটিও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। একজন করদাতার আয় থেকে জীবনযাপন ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বাস্তবে যে পরিমাণ নগদ থাকার কথা, রিটার্নে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়া উচিত।

অর্থাৎ, প্রকৃতপক্ষে হাতে থাকা নগদ অর্থই রিটার্নে দেখানো নিরাপদ।

৩. পাওয়া উপহারের তথ্য রিটার্নে না দেখানো

পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারের তথ্য রিটার্নে বাদ দেওয়াও একটি সাধারণ ভুল। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানদের কাছ থেকে পাওয়া জমি, ফ্ল্যাট, সোনার গয়না কিংবা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ থাকলে সেগুলোর তথ্য যথাযথভাবে রিটার্নে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

এ ধরনের পারিবারিক উপহারের ক্ষেত্রে সাধারণত কর দিতে হয় না। তবে সম্পদের প্রকৃত অবস্থান ও মালিকানার তথ্য সঠিকভাবে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে ভবিষ্যতে ওই সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর বা সম্পদ বিবরণীতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে আগের রিটার্নে তথ্য না থাকার কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই উপহার হিসেবে পাওয়া সম্পদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংরক্ষণ করা উচিত।

৪. এফডিআর, ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের মতো বিনিয়োগ গোপন করা

রিটার্নে বিনিয়োগের তথ্য না দেখানোও করদাতাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট খাতে যথাযথভাবে উল্লেখ করা উচিত।

বর্তমানে আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই বা শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ফলে কোনো বিনিয়োগ রিটার্নে না দেখালেও পরবর্তী সময়ে সেটি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে।

অন্যদিকে, আইন অনুযায়ী অনুমোদিত ও যোগ্য বিনিয়োগ যথাযথভাবে রিটার্নে দেখানো হলে করদাতা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর সুবিধাও পেতে পারেন। তাই বিনিয়োগ গোপন না করে সঠিক তথ্য দেওয়া করদাতার জন্য বেশি নিরাপদ।

৫. আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় দেখানো

রিটার্নে আয় ও ব্যয়ের তথ্য দেওয়ার সময়ও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো করদাতা যদি তার ঘোষিত আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থের উৎস কী?

যেমন, একজন করদাতার আয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও যদি রিটার্নে জীবনযাপন, সম্পদ ক্রয় বা অন্যান্য ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি দেখানো হয়, তাহলে ওই অতিরিক্ত অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে হতে পারে।

তাই রিটার্নে আয়, ব্যয় এবং সম্পদের মধ্যে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য রাখা জরুরি।

প্রথমবার রিটার্নে আরও বেশি সতর্কতা

প্রথমবার আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে করদাতাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ রিটার্নে প্রথমবার কোনো সম্পদ, আয় বা বিনিয়োগ দেখানোর সময় তার উৎস সম্পর্কে যথাযথ ব্যাখ্যা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

জমি, ফ্ল্যাট, সোনা, নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র কিংবা অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কাগজপত্র, দলিল, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিনিয়োগের সনদসহ সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত।

শেষ কথা

অনলাইনে রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে তথ্য দেওয়ার সুযোগ যেমন সহজ হচ্ছে, তেমনি ভুল তথ্য বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে আয়, ব্যয়, নগদ অর্থ, সোনার গয়না, উপহার, ব্যাংক আমানত ও বিনিয়োগসহ সব সম্পদের তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রিটার্নে বাস্তব তথ্য দিতে হবে এবং আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। কোনো সম্পদ বা আয়ের উৎস নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠলে যাতে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও প্রমাণপত্র দেওয়া যায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণ করাও জরুরি।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *