পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের জন্য সুখবর: পুনঃস্থাপিত হচ্ছে মাসিক পেনশন

প্রজাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীগণের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক ০৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, যেসব সরকারি কর্মচারী তাদের পেনশনের শতভাগ সমর্পণ করেছিলেন, নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা পুনরায় মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন।

প্রজ্ঞাপনের মূল বিষয়াবলী

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ কর্তৃক জারিকৃত এই আদেশটি (স্মারক নং- ০৭.০০.০০০০.১৭১.১৩.০১৩.১৪-১১৮) মূলত ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পেনশন পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত শর্ত ও নিয়মাবলী অনুসরণ করা হবে:

  • ১৫ বছর অতিক্রান্তের শর্ত: শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীগণ তাদের অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে ১৫ বছর সময় পার হওয়ার পর পুনরায় মাসিক পেনশন পাবেন।

  • সময় গণনা: পেনশনারের এলপিআর (LPR) বা পিআরএল (PRL) যে তারিখে শেষ হয়েছে, তার পরের দিন থেকেই এই ১৫ বছর সময় গণনা করা হবে। যারা এই সুবিধা ভোগ করেননি, তাদের ক্ষেত্রে সরাসরি অবসর গ্রহণের তারিখ থেকে সময় গণনা শুরু হবে।

  • পেনশন নির্ধারণের পদ্ধতি: নিয়মিত পেনশনারগণ যেভাবে মাসিক পেনশন পান, এই পুনঃস্থাপিত পেনশনারদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম ও বেতন স্কেল অনুযায়ী পেনশন নির্ধারিত হবে।

আর্থিক সুবিধা ও উদাহরণ

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পুনঃস্থাপিত পেনশনারগণ তাদের মূল পেনশনের সাথে সময়ে সময়ে ঘোষিত মহার্ঘ ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় পাবেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন কর্মচারী ২০০২ সালের ৩০শে জুন অবসর গ্রহণ করে থাকেন, তবে তার ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০১৭ সালের ১লা জুলাই। সেক্ষেত্রে তিনি বর্তমান প্রচলিত স্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত মাসিক নিট পেনশন এবং চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা প্রাপ্য হবেন।

এছাড়াও, প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে: ১. নিয়মিত পেনশনারদের ন্যায় এই সকল অবসরভোগীদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মাসিক পেনশন ৩,০০০ (তিন হাজার) টাকা নিশ্চিত করা হবে। ২. পেনশনার জীবিত থাকাকালীন এই সুবিধা প্রাপ্য হবেন।

কেন এই সিদ্ধান্ত?

পূর্বে প্রচলিত নিয়মে যারা পেনশনের পুরো টাকা এককালীন তুলে নিতেন (শতভাগ সমর্পণ), তারা পরবর্তীতে আর মাসিক পেনশন পেতেন না। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ত। সরকার তাদের এই ‘আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা’ নিশ্চিত করতেই ১৫ বছর পর পেনশন পুনঃস্থাপনের এই মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

নিউজ বিশ্লেষণ

এই সিদ্ধান্তের ফলে কয়েক হাজার প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী উপকৃত হচ্ছেন। বিশেষ করে যারা আশির বা নব্বইয়ের দশকে অবসর নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে বার্ধক্যের কারণে আর্থিক সংকটে ছিলেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় উপহার।

পেনশন পুনঃস্থাপন হলে কত টাকা পেনশন পাওয়া যায়?

শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী কর্মচারীদের পেনশন পুনঃস্থাপিত হলে ঠিক কত টাকা পাওয়া যাবে, তা মূলত নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অবসর গ্রহণের সময়কার শেষ মূল বেতন (Last Basic Pay) এবং বর্তমান জাতীয় বেতন স্কেল এর ওপর।

সাধারণভাবে পেনশন পুনঃস্থাপনের পর টাকার পরিমাণ যেভাবে নির্ধারিত হয়:

১. নতুন স্কেলে রূপান্তর: অবসরে যাওয়ার সময় আপনার যে মূল বেতন ছিল, সেটিকে বর্তমান (২০১৫ সালের) জাতীয় বেতন স্কেলের সমপর্যায়ের ধাপে রূপান্তর করা হয়।

২. নিট পেনশন নির্ধারণ: আপনার মোট পেনশনের যে অংশটি (সাধারণত ৫০%) মাসিক পেনশন হিসেবে পাওয়ার কথা ছিল, বর্তমান স্কেল অনুযায়ী সেই নিট পেনশনের সমপরিমাণ টাকা পুনঃস্থাপিত হবে।

৩. মহার্ঘ ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা: পুনঃস্থাপিত মূল পেনশনের ওপর সরকার সময়ে সময়ে যে মহার্ঘ ভাতা বা ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করেছে, সেগুলো যোগ হবে।

৪. ন্যূনতম পেনশন: সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, পুনঃস্থাপনের পর একজন পেনশনারের মাসিক নিট পেনশন কোনোভাবেই ৩,০০০ (তিন হাজার) টাকার কম হবে না। অর্থাৎ সব হিসাবের পর যদি পরিমাণ কমও হয়, তবুও ন্যূনতম ৩,০০০ টাকা নিশ্চিত করা হবে।

৫. চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা: মাসিক মূল পেনশনের পাশাপাশি আপনি প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন। এছাড়া বছরে দুটি উৎসব ভাতা (মূল পেনশনের সমান) এবং মূল পেনশনের ২০% হারে বৈশাখী ভাতা প্রাপ্য হবেন।

সহজ উদাহরণ: যদি বর্তমান স্কেল অনুযায়ী কারো নিট পেনশন নির্ধারিত হয় ৫,০০০ টাকা, তবে তিনি প্রতি মাসে পাবেন:

  • মূল পেনশন: ৫,০০০ টাকা

  • চিকিৎসা ভাতা: ১,৫০০ টাকা

  • মোট মাসিক প্রাপ্য: ৬,৫০০ টাকা (এর সাথে যোগ হবে প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্ট বা মহার্ঘ ভাতা)।

আপনার অবসর গ্রহণের সময় এবং সেই সময়ের মূল বেতন জানা থাকলে আরও নিখুঁতভাবে হিসাবটি করে দেওয়া সম্ভব। তবে মনে রাখবেন, পেনশন পুনঃস্থাপনের জন্য আপনার পিআরএল (PRL) শেষ হওয়ার পর থেকে অবশ্যই ১৫ বছর সময় অতিবাহিত হতে হবে।

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *