শিক্ষা ভাতা । পোষাক । রেশন

সরকারি কর্মকর্তাদের অফিস পোশাক নিয়ে নির্দেশনা: স্যুট-টাই নয়, আবহাওয়া অনুযায়ী পোশাক পরার ওপর গুরুত্ব

বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জারি করা পরিপত্র বিশ্লেষণে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পুরুষ কর্মকর্তাদের অফিসে পোশাক পরিধান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার তথ্য পাওয়া যায়। এসব নির্দেশনায় একদিকে দাপ্তরিক শালীনতা ও আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে গরমের সময় অপ্রয়োজনীয় স্যুট-টাই পরিহার করে আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

আপলোড করা নথিগুলোতে ২০০৯, ২০১২, ২০১৩, ২০১৭ ও ২০২২ সালের বিভিন্ন নির্দেশনা এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোর অনুসরণ ও সংশোধনসংক্রান্ত পত্রের উল্লেখ রয়েছে। এসব নথির মূল বক্তব্য হলো, অফিসে পোশাকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং তাপমাত্রা ও ঋতুর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

গরমের সময় স্যুট-টাই পরিধান না করার নির্দেশনা

নথিগুলোর মধ্যে ৫ জুন ২০১২ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা একটি পরিপত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে বিদ্যুতের সাশ্রয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিসে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের তাপমাত্রা এবং আবহাওয়া অনুযায়ী পোশাক পরিধানের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পরিপত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পুরুষ কর্মকর্তাদের মার্চ থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলে স্যুট-টাই পরিধান না করে অফিসে প্যান্ট ও শার্ট পরিধানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। শার্টের ক্ষেত্রে অর্ধহাতা অথবা পূর্ণহাতা ব্যবহারের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, গরমের মাসগুলোতে দাপ্তরিক পরিবেশ বজায় রেখেও তুলনামূলক আরামদায়ক পোশাক পরিধানের সুযোগ রাখার বিষয়টি এসব নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রসঙ্গ

নথিতে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রাখার নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুতের সাশ্রয় নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যবহারকে নির্ধারিত নীতির আওতায় আনা।

এখানে দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, এয়ারকন্ডিশনারের তাপমাত্রা নির্ধারণসংক্রান্ত নির্দেশনা; দ্বিতীয়ত, অফিসে কর্মকর্তাদের পোশাক পরিধানের নির্দেশনা। নথিতে বিষয় দুটি একই প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হলেও এগুলো পৃথকভাবে অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা।

২০১৩ সালে নির্দেশনা পুনরায় জারির তথ্য

আপলোড করা নথির আরেকটি অংশে ১৩ মে ২০১৩ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা পরিপত্রের উল্লেখ রয়েছে। এতে বিদ্যুতের সাশ্রয় নিশ্চিত করা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অফিসের পোশাক পরিধানের আগের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পোশাকসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল পোশাকের ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সরকারি দপ্তরগুলোতে নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করার বিষয়টিও প্রশাসনিক গুরুত্ব পেয়েছিল।

২০১৭ সালে নির্দেশনা সংশোধন নিয়ে মতামত চাওয়ার তথ্য

আপলোড করা একটি নথিতে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি পত্র দেখা যায়। সেখানে কর্মকর্তাদের অফিসে পোশাক পরিধানসংক্রান্ত নির্দেশনা সংশোধন, স্পষ্টীকরণ অথবা সময়সীমা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে অনুরোধ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের পত্রের তাৎপর্য হলো, আগে জারি করা নির্দেশনা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে পর্যালোচনা বা মতামত গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শুধু মতামত চাওয়ার পত্রের ভিত্তিতে নির্দেশনা সংশোধিত হয়েছে বা আগের নির্দেশনা বাতিল হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সে জন্য পরবর্তী চূড়ান্ত আদেশ বা সংশোধিত পরিপত্রের প্রমাণ প্রয়োজন।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের করণীয়

নথিতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা বিভাগের পক্ষ থেকেও আগের নির্দেশনা অনুসরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিশাখা ও শাখায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এতে স্পষ্ট হয়, কেন্দ্রীয়ভাবে জারি করা পরিপত্র বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নিজ নিজ অধীন দপ্তরকে অবহিত করার ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা সম্পর্কে জানানো এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে তা অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নির্দেশনার মূল বিষয়গুলো

আপলোড করা নথিগুলোর আলোকে প্রধান বিষয়গুলো হলো—

1. গরমের সময়ে আরামদায়ক দাপ্তরিক পোশাক: মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা না থাকলে স্যুট-টাই পরিহার করে প্যান্ট ও শার্ট পরিধানের নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে।

2. শার্টের ধরন: অর্ধহাতা অথবা পূর্ণহাতা শার্ট পরিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

3. বিদ্যুৎ সাশ্রয়: এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার নির্দেশনা নথিতে রয়েছে।

4. নির্দেশনা বাস্তবায়ন: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নির্দেশনাগুলো অনুসরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

5. সংশোধন বা স্পষ্টীকরণ: ২০১৭ সালের পত্রে নির্দেশনা সংশোধন বা স্পষ্টীকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মতামত চাওয়ার তথ্য রয়েছে।

বর্তমানে কোন নির্দেশনা কার্যকর?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। আপলোড করা নথিগুলো মূলত বিভিন্ন বছরের পুরোনো সরকারি পরিপত্র ও দাপ্তরিক পত্রের অনুলিপি। এসব নথি থেকে ঐতিহাসিকভাবে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা বোঝা যায়। কিন্তু ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে নির্দেশনাগুলোর কোনটি সর্বশেষ কার্যকর রয়েছে, পরবর্তী সময়ে কোনো সংশোধন হয়েছে কি না কিংবা কোনো নতুন পরিপত্র জারি হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত করতে সর্বশেষ সরকারি আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।

তাই পুরোনো পরিপত্রের ভিত্তিতে স্যুট-টাই পরিধান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কিংবা সব সরকারি কর্মকর্তার জন্য একই পোশাক বাধ্যতামূলক—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সমীচীন হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পোশাকবিধি এবং পরবর্তী সরকারি নির্দেশনা বিবেচনা করেই বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে।

শেষ কথা

সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসে পোশাক পরিধানসংক্রান্ত এসব নথি থেকে বোঝা যায়, দাপ্তরিক শালীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি আবহাওয়া, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং ব্যবহারিক সুবিধার বিষয়গুলোও প্রশাসনিক নির্দেশনায় বিবেচিত হয়েছে। বিশেষ করে গরমের সময় স্যুট-টাইয়ের পরিবর্তে প্যান্ট ও শার্ট পরিধানের যে নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে, তা সরকারি অফিসের পোশাকনীতি নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে কর্মকর্তাদের জন্য কোন নির্দেশনা বর্তমানে প্রযোজ্য, তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সর্বশেষ পরিপত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আদেশ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

সোর্স অব ইনফরর্মেশন

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *