পে-স্কেল I গেজেট । প্রজ্ঞাপন । পরিপত্র

সরকারি কর্মচারী থেকে কর্মকর্তা ২০২৬: নন-গেজেটেড কর্মচারী কি গেজেটেড কর্মকর্তা হতে পারবেন?

সরকারি চাকরিতে কর্মরত নন-গেজেটেড কর্মচারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চাকরির মেয়াদ, অভিজ্ঞতা কিংবা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার মাধ্যমে কি তারা কর্মকর্তা বা গেজেটেড কর্মকর্তা হতে পারবেন? সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই পদে নির্ধারিত সময় চাকরি পূর্ণ করার পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে গেজেটেড কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি—এই দুটি বিষয় এক নয়। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে পদোন্নতির সুযোগ থাকলে নন-গেজেটেড কর্মচারী পদোন্নতির মাধ্যমে গেজেটেড কর্মকর্তা পদে যেতে পারেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের প্রশাসন-১ শাখার ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনে কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে একই পদে ৮ বছর পূর্তির পর পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একই পদে ৮ বছর পূর্ণ করার পর ৯ম গ্রেডের উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন। অর্থাৎ এখানে মূল বিষয় হলো—তারা একই পদে থেকেই নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে উচ্চতর বেতন গ্রেডের সুবিধা পেয়েছেন।

এটি সরাসরি নতুন পদে পদোন্নতি নয়।

অর্থাৎ—

একই পদ + নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ → উচ্চতর গ্রেড

আর—

নিম্ন পদ → উচ্চ পদে পদোন্নতি → নতুন পদে দায়িত্ব

দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

৯ম গ্রেড পেলেই কি কর্মকর্তা বা গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়া যায়?

এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

কোনো কর্মচারী উচ্চতর গ্রেড পেলে তার বেতন গ্রেড পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু শুধু উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কারণে তার পদ, পদমর্যাদা বা নিয়োগের প্রকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হয় না।

অর্থাৎ কোনো নন-গেজেটেড কর্মচারী যদি উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পান, তাতে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেজেটেড কর্মকর্তা হয়ে যাবেন—এমন নিয়ম নেই।

গেজেটেড কর্মকর্তা হতে হলে সংশ্লিষ্ট পদটি গেজেটেড পদ হতে হবে এবং সেই পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে।

তবে নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়া কি সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব—যদি সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে সেই পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকে।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৮ ধারায় স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর পদোন্নতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরিসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় পদোন্নতির কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পদোন্নতির বিস্তারিত শর্ত বিধি দ্বারা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ শুধু চাকরির বয়স বেশি হলেই পদোন্নতি নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগবিধি, শূন্য পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়।

বাংলাদেশ সচিবালয়ে এর বাস্তব উদাহরণ

নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে গেজেটেড কর্মকর্তা পদে যাওয়ার বাস্তব উদাহরণ রয়েছে।

বাংলাদেশ সচিবালয় (ক্যাডার বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা এবং নন-গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৪ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে এ বিধিমালার সংশোধন করা হয়। সরকারি গেজেটেও ২০১৪ সালের মূল বিধিমালা এবং ২০২০ সালের সংশোধনী প্রকাশিত হয়েছে।

এই বিধিমালার আওতায় নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট পদে পদোন্নতির পথ রয়েছে।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সরকারি নোটিশে। সেখানে ২০১৪ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুসারে ১১ জন কর্মচারীকে ১০ম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ বাস্তবে নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে নির্দিষ্ট শর্তে ১০ম গ্রেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে।

অফিস সহায়ক থেকে কি কর্মকর্তা হওয়া সম্ভব?

এই প্রশ্নটি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের ক্ষেত্রে অফিস সহায়ক পদ থেকে সরাসরি কর্মকর্তা হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে কোন পদে এবং কীভাবে পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তার ওপর।

উদাহরণ হিসেবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত যোগ্য প্রার্থীদের দপ্তরী (গ্রেড-১৯) পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে নির্দেশ দিয়েছিল। অর্থাৎ অফিস সহায়ক থেকে উচ্চতর পদে যাওয়ার বিধিবদ্ধ সুযোগের বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। ও দপ্তরী পদে কর্মরত যোগ্য প্রার্থীদের ফটোকপি অপারেটর (গ্রেড-১৮) পদে পদোন্নতির জন্যও আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল।

এগুলো দেখায়, সরকারি চাকরিতে নিচের স্তরের কর্মচারীদের জন্য পদোন্নতির পথ থাকতে পারে। তবে কোন পদ পর্যন্ত এবং কোন কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া যাবে, সেটি সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধির ওপর নির্ভরশীল।

পদোন্নতি আর উচ্চতর গ্রেড—পার্থক্য কোথায়?

বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে নিচের উদাহরণটি গুরুত্বপূর্ণ।

১. উচ্চতর গ্রেড

ধরা যাক একজন কর্মকর্তা একই পদে ৮ বছর চাকরি করলেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করায় তিনি ৯ম গ্রেড পেলেন।

এ ক্ষেত্রে—

পদ: একই
দায়িত্ব: একই
চাকরির পদনাম: একই
বেতন গ্রেড: উচ্চতর

এটি মূলত উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা।

২. পদোন্নতি

অন্যদিকে একজন অফিস সহায়ক যদি নিয়োগবিধি অনুযায়ী কোনো উচ্চতর পদে পদোন্নতি পান, তাহলে—

আগের পদ: অফিস সহায়ক
↓
পদোন্নতি
↓
উচ্চতর পদ

এখানে পদনাম, দায়িত্ব ও পদমর্যাদা পরিবর্তিত হয়।

৩. গেজেটেড পদে পদোন্নতি

যদি সেই উচ্চতর পদটি সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী গেজেটেড কর্মকর্তা পদ হয় এবং কর্মচারী নিয়ম মেনে পদোন্নতি পান, তখন তিনি ওই পদে গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

শুধু ৮ বছর পূর্ণ করলেই কি কর্মকর্তা হওয়া যাবে?

না।

ছবিতে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের ৮ বছরের বিধানটি নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে যে কর্মকর্তারা একই পদে ৮ বছর পূর্ণ করেছেন, তাদের উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি দেখানো হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সরকারি চাকরিতে ৮ বছর পূর্ণ করলেই যেকোনো নন-গেজেটেড কর্মচারী কর্মকর্তা হয়ে যাবেন।

বরং কোনো পদে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান থাকলে সেই বিধান অনুযায়ী সুবিধা পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে কর্মকর্তা পদে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতির বিধান অনুসরণ করতে হবে।

পদোন্নতির ক্ষেত্রে কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনার কাঠামো রয়েছে।

বাস্তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে সাধারণত যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়া;
  • প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা;
  • সংশ্লিষ্ট পদে শূন্য পদ থাকা;
  • জ্যেষ্ঠতা;
  • চাকরির রেকর্ড;
  • বিভাগীয় মামলা বা শাস্তির বিষয়;
  • প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ;
  • নিয়োগবিধির অন্যান্য শর্ত;
  • পদোন্নতি কমিটির সুপারিশ এবং
  • যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।

তাই শুধু চাকরির বয়সের ওপর ভিত্তি করে কর্মকর্তা হওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।

নতুন বেতন স্কেলেও বিষয়টি আলাদা থাকবে

২০২৬ সালের জাতীয় বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি ও বেতন নির্ধারণ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু নতুন বেতন গ্রেড পাওয়া এবং পদোন্নতি পাওয়া একই বিষয় নয়।

কোনো কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের সময় উচ্চতর গ্রেড বা পে-ফিক্সেশনের ফলে বেতন বৃদ্ধি হতে পারে। কিন্তু এর ফলে তার মূল পদটি পরিবর্তিত না হলে তিনি নতুন পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়ে যান না।

তাই ২০২৬ সালের বেতন নির্ধারণের সময়ও কর্মচারীদের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।

গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়ার ক্ষেত্রে মূল শর্ত

সবচেয়ে সহজ ভাষায় বিষয়টি হলো—

“গ্রেড” হলো বেতনের বিষয়, আর “পদ” হলো চাকরির পদমর্যাদা ও দায়িত্বের বিষয়।

একজন কর্মচারী উচ্চতর গ্রেড পেতে পারেন, কিন্তু তার পদ একই থাকতে পারে।

আবার একজন কর্মচারী পদোন্নতির মাধ্যমে নতুন পদে যেতে পারেন। সেই নতুন পদ যদি গেজেটেড পদ হয়, তাহলে তিনি গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

তাই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে

বিষয়কী পরিবর্তন হয়?
উচ্চতর গ্রেডবেতন গ্রেড
পদোন্নতিপদ, দায়িত্ব ও পদমর্যাদা
গেজেটেড পদে পদোন্নতিনতুন গেজেটেড কর্মকর্তা পদে নিয়োগ/পদোন্নতি

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়োগবিধিই চূড়ান্ত

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি দপ্তরের নিয়ম অন্য দপ্তরে হুবহু প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের ক্যাডারবহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য আলাদা নিয়োগবিধি রয়েছে।

আবার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জনপ্রশাসন, ভূমি, স্থানীয় সরকার বা অন্যান্য অধিদপ্তর/বিভাগের পদগুলোর ক্ষেত্রে নিজস্ব নিয়োগবিধি থাকতে পারে।

ফলে একজন অফিস সহায়ক, দপ্তরী, নিরাপত্তা প্রহরী বা অন্য কোনো নন-গেজেটেড কর্মচারী কর্মকর্তা হতে পারবেন কি না—এর উত্তর দিতে হলে প্রথমে দেখতে হবে তার নিজস্ব পদের নিয়োগবিধিতে কোন পদে পদোন্নতির সুযোগ রাখা হয়েছে।

শেষ কথা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনটি মূলত একই পদে দীর্ঘ সময় চাকরির পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার উদাহরণ। এটিকে নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়ার সরাসরি বিধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে সরকারি চাকরিতে নন-গেজেটেড কর্মচারী থেকে গেজেটেড কর্মকর্তা হওয়া আইনগতভাবে অসম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলে, নির্ধারিত যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় পদোন্নতি পেলে একজন নন-গেজেটেড কর্মচারী গেজেটেড কর্মকর্তা পদে যেতে পারেন। বাংলাদেশ সচিবালয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের পদোন্নতির সরকারি উদাহরণও রয়েছে।

সুতরাং ২০২৬ সালের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—“৮ বছর চাকরি = গেজেটেড কর্মকর্তা” নয়; বরং “নিয়োগবিধিতে পদোন্নতির সুযোগ + যোগ্যতা + শূন্য পদ + বিধিসম্মত প্রক্রিয়া = গেজেটেড পদে যাওয়ার সম্ভাবনা।”

সোর্স ফাইল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *