নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

সরকারি চাকুরিজীবীদের অর্জিত ছুটি ও লাম্পগ্র্যান্ট নগদায়ন বিধিমালা: একটি বিশদ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও সরকারি চাকুরি বিধিমালায় কর্মচারীদের অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা এবং ছুটি নগদায়ন (Leave Encashment) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের পর, একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার জমাকৃত অর্জিত ছুটির বিপরীতে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে প্রচলিত বিধি-বিধান ও জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা না জানার কারণে অনেক সময় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে দেখা যায়।

ছুটি নগদায়ন ও পিআরএল (PRL) সংক্রান্ত বর্তমান বিধিমালা

২০১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপন এবং জাতীয় वेतन স্কেল ২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ১০(২) অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কমচারীদের ছুটি নগদায়নের নিয়মে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বে যেখানে সর্বোচ্চ ১২ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধা ছিল, তা সংশোধন করে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১৮ মাস করা হয়েছে।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, একজন স্থায়ী চাকুরিজীবী প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে পূর্ণ গড় বেতনে অর্জিত ছুটি (Earned Leave) পেয়ে থাকেন। অবসরে যাওয়ার সময় এই জমাকৃত ছুটি মূলত দুটি ভাগে ব্যবহৃত হয়:

  1. অবসর-উত্তর ছুটি (PRL): অবসরকালীন ছুটির পাওনা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ১২ মাস বা ১ বছর পর্যন্ত পিআরএল ভোগ করা যায়। এই সময়ে কর্মকর্তা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি পেয়ে থাকেন।

  2. ছুটির নগদায়ন বা লাম্পগ্র্যান্ট (Lump Grant): পিআরএল-এ যাওয়ার প্রাক্কালে জমাকৃত ছুটি থেকে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের (৫าะ দিন) মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এককালীন নগদায়ন বা ল্যাম্পগ্র্যান্ট হিসেবে উত্তোলন করা যায়।

গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম: অবসর-উত্তর ছুটি (PRL) ভোগ না করলেও বা আংশিক ভোগ করলেও এই আর্থিক সুবিধা (১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ) শতভাগ প্রাপ্য হবে। উপরন্তু, পিআরএল এবং ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে ০২ (দুই) দিনের অর্ধগড় বেতনের ছুটিকে ০১ (এক) দিনের গড় বেতনের ছুটিতে রূপান্তর (Conversion) করা যাবে।

দীর্ঘ ৩০ বছরের চাকুরিজীবী ও ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ছুটি হিসাবের বাস্তব চিত্র

ধরা যাক, একজন কর্মকর্তা দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সরকারি চাকুরিতে নিয়োজিত আছেন এবং বর্তমানে তিনি ৫ম গ্রেডে (যা সাধারণত উপসচিব বা সমমান পদের স্কেল) কর্মরত। বিধিমালা অনুযায়ী, তার মোট জমাকৃত ছুটির হিসাব এবং তা থেকে প্রাপ্য সুবিধার সমীকরণটি নিম্নরূপ হবে:

বিবরণসময়কাল / দিনপ্রযোজ্য নিয়ম ও মন্তব্য
সর্বোচ্চ পিআরএল (PRL) সুবিধা১২ মাস (৩৬০ দিন)পূর্ণ গড় বেতনে ছুটি ভোগ।
সর্বোচ্চ ছুটি নগদায়ন (Lump Grant)১৮ মাস (৫৪০ দিন)অবসরকালীন মূল বেতনের ভিত্তিতে এককালীন প্রাপ্য।
মোট কার্যকর ছুটি সীমা৩০ মাস (৯০০ দিন)এর অতিরিক্ত জমাকৃত ছুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদি (Lapse) হবে।

যদি কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘ ৩০ বছরের চাকুরিজীবনে বছরে গড়ে ৪৮ দিন করে মোট ১৪৪০ দিন অর্জিত ছুটি জমা করেন, তবে বিধি অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ ৩০ মাস বা ৯০০ দিনের (১২ মাস পিআরএল + ১৮ মাস নগদায়ন) সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অবশিষ্ট ৫৪০ দিনের ছুটি কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক কাজে আসবে না, তা আইন অনুযায়ী তামাদি বা ল্যাপ্স হয়ে যাবে।

৫ম গ্রেডের কর্মকর্তার সাধারণ নিয়ম না জানা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রশাসনিক স্তরের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ (৫ম গ্রেড) একজন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অর্জিত ছুটি নগদায়নের বেসিক নিয়মটি জানতে চাওয়ায় সংশ্লিষ্ট চাকুরি-জীবী ও বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক আলোচনা ও মিশ্র REACTIONS-এর সৃষ্টি হয়েছে। ৫ম গ্রেড হলো রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ডিল করার স্তর। এই স্তরের একজন কর্মকর্তার এই মৌলিক নিয়মটি না জানা নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

ছুটি বিধিমালা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর সরকারি দপ্তরগুলোতে অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবশ্যিক প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা থাকে। সেখানে সার্ভিস রুলস ও ফিন্যান্সিয়াল রুলস বিস্তারিত শেখানো হয়। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এই বিষয়ে ধারণা স্পষ্ট না থাকাটা অধস্তনদের ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একাংশের মতে, নিয়মের জটিলতা বা সাম্প্রতিক সংশোধনীর কারণে অনেক সময় দীর্ঘ চাকুরিজীবী কর্মকর্তাদের মনেও সাময়িক দ্বিধা তৈরি হতে পারে, যা আলোচনার মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া ইতিবাচক।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত), ডিসেম্বর ২০, ২০১৫ এবং জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ (অনুচ্ছেদ ১০)

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *