সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে বড় পরিবর্তন: ২০২৬ সালে যুক্ত হতে পারে নতুন ৭ সুবিধা

দেশের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন, পেনশন পাওয়ার বয়স কমানো, জমার বিপরীতে ঋণ, স্বাস্থ্যবিমা, শরিয়াহভিত্তিক পেনশন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্কিম থেকে বের হয়ে জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ। তবে এগুলোকে এখনই কার্যকর সুবিধা হিসেবে না দেখে প্রস্তাবিত সংস্কার হিসেবে দেখা জরুরি।

কেন নতুন সুবিধা আনার উদ্যোগ

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর তিন বছর পরও প্রত্যাশিত মাত্রায় অংশগ্রহণ বাড়েনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি স্কিমে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজারের কাছাকাছি নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ব্যবস্থাটিকে মানুষের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করতে নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অধীনে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটেও এসব স্কিমে নিবন্ধনের তথ্য ও সুবিধাগুলো প্রকাশ করা হয়েছে।

১. পেনশনভোগীর স্বামী বা স্ত্রী পাবেন আজীবন পেনশন

প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবিত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার ব্যবস্থা

বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশন গ্রহণ শুরু করার পর গ্রাহক মারা গেলে নমিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পেনশনের সমপরিমাণ অর্থ পাওয়ার সুযোগ পান। নতুন প্রস্তাবে এই সুবিধাকে আরও দীর্ঘমেয়াদি করার চিন্তা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রী যাতে হঠাৎ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় না পড়েন, সে জন্য একটি ধারাবাহিক আয়ের ব্যবস্থা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

২. পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে ৫৫ করার প্রস্তাব

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সাধারণভাবে ৬০ বছর বয়সে পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন সংস্কার প্রস্তাবে এই বয়স ৫৫ বছর করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে বয়স কমানোর প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে কার্যকর হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই ৫৫ বছর হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন পাওয়া যাবে—এমন দাবি এখনই করা ঠিক হবে না।

৩. জমাকৃত অর্থের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার সুযোগ

সর্বজনীন পেনশনে দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—জরুরি প্রয়োজনে জমা অর্থের কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে কি না।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পেনশন হিসাবের জমার বিপরীতে নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ নেওয়ার সুযোগ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আইনগতভাবে এমন সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে এটি এখনো চালু হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সুবিধা চালু হলে পেনশন সঞ্চয় পুরোপুরি দীর্ঘমেয়াদে আটকে না রেখে জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে সীমিতভাবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে কত শতাংশ ঋণ পাওয়া যাবে, সুদের হার কত হবে এবং কীভাবে পরিশোধ করতে হবে—এসব বিস্তারিত নিয়ম চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন।

৪. পেনশনারদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা

নতুন পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় পেনশন গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি খসড়া পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকা নামমাত্র প্রিমিয়াম নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি এখনো প্রস্তাবিত পরিকল্পনা; চূড়ান্ত স্বাস্থ্যবিমা প্যাকেজ, চিকিৎসার সীমা, কারা কী সুবিধা পাবেন এবং কোন কোন চিকিৎসা এর আওতায় থাকবে—এসব বিস্তারিত এখনো চূড়ান্ত নয়।

৫. শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম

সর্বজনীন পেনশনে আরও বেশি মানুষকে যুক্ত করতে শরিয়াহভিত্তিক একটি পৃথক সংস্করণ চালুর বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে।

তবে শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের বিনিয়োগ পদ্ধতি, চাঁদার কাঠামো, মুনাফা বণ্টন এবং পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে চূড়ান্ত নীতিমালা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

৬. পাঁচ বছর চাঁদার পর বিশেষ পরিস্থিতিতে টাকা ফেরতের সুযোগ

দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় নিয়মিত চাঁদা দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় এনে নতুন একটি বিশেষ এক্সিট সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্তত ৫ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার কারণে পেনশন ব্যবস্থায় আর থাকতে না চাইলে বিশেষ বিবেচনায় তাঁর জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

তবে এটি সাধারণভাবে ইচ্ছামতো স্কিম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ নয়। কোন পরিস্থিতিকে শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কী প্রমাণ লাগবে এবং কত টাকা ফেরত দেওয়া হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত বিধান প্রয়োজন হবে।

৭. এককালীন অর্থ উত্তোলনের সুবিধার সঙ্গে নতুন কাঠামো

২০২৬ সালে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত ব্যবস্থায় পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের পর করপাসের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন উত্তোলনের সুযোগের কথা এসেছে। অবশিষ্ট অর্থের ভিত্তিতে মাসিক পেনশন নির্ধারণের কাঠামো রাখা হয়েছে।

এটি সেপ্টেম্বরের নতুন প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে শুধু অবসরের পর মাসিক টাকা পাওয়ার একটি ব্যবস্থা হিসেবে না রেখে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়, জরুরি আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

২০২৬ সালের পরিবর্তনগুলো এক নজরে

প্রস্তাবিত/নতুন সুবিধাকী পরিবর্তন হতে পারে
স্বামী/স্ত্রীর আজীবন পেনশনপেনশনভোগীর মৃত্যুর পর জীবিত স্বামী বা স্ত্রীকে দীর্ঘমেয়াদি পেনশন
৫৫ বছরে পেনশনপেনশন শুরুর বয়স ৬০ থেকে ৫৫ করার প্রস্তাব
ঋণ সুবিধাজমাকৃত অর্থের বিপরীতে নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ
স্বাস্থ্যবিমানামমাত্র প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবিমার প্রস্তাব
শরিয়াহভিত্তিক স্কিমশরিয়াহসম্মত কাঠামোয় পৃথক পেনশন সংস্করণের পরিকল্পনা
বিশেষ এক্সিট৫ বছর চাঁদার পর অক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জমা অর্থ ফেরতের প্রস্তাব
এককালীন উত্তোলনপেনশনযোগ্য হলে করপাসের সর্বোচ্চ ৩০% এককালীন উত্তোলনের সুযোগ

তবে সব সুবিধা এখনই কার্যকর নয়

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সাতটি সুবিধার সবগুলোকে কার্যকর সরকারি সুবিধা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের বিষয় রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিধিমালা সংশোধন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে ২০২৬ সালে সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনসহ কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যে এসেছে—এটি নতুন সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ

সর্বজনীন পেনশনের মূল উদ্দেশ্য হলো কর্মজীবন শেষে মানুষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য আয় নিশ্চিত করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের কয়েকটি স্বাভাবিক উদ্বেগ থাকে—জরুরি সময়ে টাকা ব্যবহার করা যাবে কি না, মৃত্যুর পর পরিবারের কী হবে, চিকিৎসা ব্যয় কীভাবে সামলানো হবে এবং দীর্ঘদিন চাঁদা দেওয়ার পর কোনো কারণে আর চালিয়ে যেতে না পারলে কী হবে।

নতুন প্রস্তাবগুলোর বড় অংশ মূলত এসব প্রশ্নের সমাধানকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর আজীবন পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা এবং জরুরি ঋণ সুবিধা চালু হলে পেনশন ব্যবস্থার সামাজিক সুরক্ষা উপাদান আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে ৫৫ বছর বয়সে পেনশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে অবসর-পরবর্তী আয় পাওয়ার সময়ও এগিয়ে আসবে।

তবে এসব সুবিধার প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা, যোগ্যতার শর্ত, চাঁদার পরিমাণ, বিনিয়োগের মুনাফা, ঋণের সীমা এবং স্বাস্থ্যবিমার আওতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয় তার ওপর।

সুতরাং, ২০২৬ সালের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে—পেনশনকে শুধু ভবিষ্যতের মাসিক আয়ের ব্যবস্থা না রেখে পরিবার সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি অর্থায়ন ও নমনীয়তার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ। তবে প্রস্তাবিত সুবিধাগুলো চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও বিধিমালা সংশোধনের পরই কোন সুবিধা কখন থেকে কার্যকর হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *