সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

পেনশনযোগ্য চাকরিকালে ঘাটতি প্রমার্জনের বিধান, ৬ মাস পর্যন্ত মিলতে পারে বিশেষ সুবিধা

সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন নির্ধারণে পেনশনযোগ্য চাকরিকালের হিসাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাকরিকাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সামান্য কয়েক মাসের ঘাটতিও অনেক সময় পেনশন ও আনুতোষিকের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রচলিত বিধান ও অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট আদেশে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাকরিকালের ঘাটতি প্রমার্জন হিসেবে গণনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের ১৪ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের ০৭.০০.০০০০.১৭১.১৩.০০৬.১৫-৮১ নম্বর প্রজ্ঞাপন–সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ও ঘাটতি প্রমার্জনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিধানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৫ বছর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে সেটি প্রমার্জনের সাধারণ সুযোগ নেই। তবে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী পূর্ণ বছর সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঘাটতি প্রমার্জনের বিধান রয়েছে।

৫ বছর পূর্ণ করার ক্ষেত্রে কী নিয়ম?

বর্তমান ব্যবস্থায় পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ন্যূনতম সীমা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পেনশন পাওয়ার বিধান আলাদা করে বিবেচনা করতে হয়। অর্থ বিভাগের ২০১৫ সালের প্রজ্ঞাপনের ব্যাখ্যায় ৫ থেকে ২৪ বছর পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে পেনশন প্রাপ্যতার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন—পেনশনযোগ্য চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু, মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে অক্ষম ঘোষিত হওয়া, পদ বিলুপ্তির কারণে ছাঁটাই ইত্যাদি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই চাকরিকালে ঘাটতি থাকলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমার্জন করে ৫ বছর হিসেবে গণনা করা যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

অর্থাৎ, ৫ বছর পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের ঘাটতি থাকলে শুধু ৬ মাসের নিয়ম দেখিয়ে সেটি পূরণ করা যাবে না।

তাহলে ৬ মাসের প্রমার্জন কোথায় প্রযোজ্য?

মূল বিষয়টি হলো—একজন কর্মচারীর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর, পরবর্তী একটি পূর্ণ বছর সম্পন্ন করতে গিয়ে যদি কিছু সময়ের ঘাটতি থাকে, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেই ঘাটতি প্রমার্জিত হিসেবে গণনা করার বিধান রয়েছে।

ছবিতে থাকা অর্থ বিভাগের নির্দেশনার উদাহরণ অনুযায়ী, ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর অতিরিক্ত একটি বছর পূর্ণ করতে গিয়ে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত ঘাটতি থাকলে তা প্রমার্জিত হিসেবে গণনার সুযোগ থাকতে পারে।

এ কারণে বিষয়টি সহজভাবে মনে রাখার নিয়ম হলো—

৫ বছর পূর্ণ করার ঘাটতি ≠ ৬ মাসের প্রমার্জন

কিন্তু

৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী পূর্ণ বছর অর্জনের ঘাটতি ≤ ৬ মাস → নির্দিষ্ট বিধান সাপেক্ষে প্রমার্জনের সুযোগ।

উদাহরণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার

ধরা যাক, কোনো সরকারি কর্মচারীর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হয়েছে ২৪ বছর ৬ মাস

এক্ষেত্রে পরবর্তী পূর্ণ বছর অর্থাৎ ২৫ বছর পূর্ণ হতে তার ৬ মাস ঘাটতি রয়েছে। প্রদত্ত আদেশের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ঘাটতি নির্ধারিত বিধানের আওতায় প্রমার্জনযোগ্য হলে তার চাকরিকাল ২৫ বছর হিসেবে গণনার সুযোগ থাকতে পারে।

অন্যদিকে, কোনো কর্মচারীর চাকরিকাল যদি হয় ২৪ বছর ৫ মাস ২৯ দিন, তাহলে ২৫ বছর পূর্ণ করতে ঘাটতি ৬ মাসের চেয়ে সামান্য বেশি। সে ক্ষেত্রে ৬ মাসের সীমা অতিক্রম করায় সংশ্লিষ্ট প্রমার্জন সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।

অর্থাৎ, ৬ মাস পর্যন্ত ঘাটতি এবং ৬ মাসের বেশি ঘাটতি—দুই পরিস্থিতিকে একভাবে দেখা যাবে না।

৫ বছর ৯ মাস হলে কী হবে?

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ বছর ৯ মাস

এখানে ৫ বছর ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। পরবর্তী এক বছর পূর্ণ করতে আরও ৩ মাস প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বিধানের শর্ত পূরণ হলে এই ধরনের ঘাটতি প্রমার্জনের আওতায় আসতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—প্রমার্জন মানেই সব ধরনের অবসর বা সব ধরনের পেনশন দাবিতে স্বয়ংক্রিয় সুবিধা নয়। কর্মচারীর অবসরের ধরন, চাকরির প্রকৃতি, পেনশনযোগ্য চাকরিকালের হিসাব এবং প্রযোজ্য বিধান একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

৫ বছরের কম চাকরিকাল হলে বিষয়টি আলাদা

অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে—চাকরিকাল ৪ বছর ৬ মাস হলে ৬ মাসের প্রমার্জন নিয়ে ৫ বছর পূর্ণ করে পেনশন পাওয়া যাবে।

প্রদত্ত বিধানের আলোকে এভাবে বিষয়টি দেখা ঠিক নয়।

৬ মাসের প্রমার্জনের বিধানটি ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পরবর্তী পূর্ণ বছর অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ঘাটতিকে একই নিয়মে প্রমার্জন করার সুযোগ আছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

স্বেচ্ছা অবসরের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন

পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ঘাটতি প্রমার্জনের বিষয়টি আলোচনা করার সময় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের বিষয়টিও আলাদা করে দেখতে হয়। প্রদত্ত আদেশে উল্লেখিত ব্যাখ্যায় Public Servants (Retirement) Act, 1974-এর ধারা ৯(১) উপধারার অধীনে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের ক্ষেত্রে উল্লিখিত প্রমার্জনের সুবিধা প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ রয়েছে।

ফলে কোনো কর্মচারীর চাকরিকাল ২৪ বছর ৬ মাস হলেই সব পরিস্থিতিতে ২৫ বছর হিসেবে পেনশন নির্ধারণ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। অবসর কোন বিধানের অধীনে হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ?

পেনশনযোগ্য চাকরিকালের প্রতিটি বছর পেনশন ও আনুতোষিকের হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকারি চাকরির পেনশন-সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশনা ও চাকরিকাল গণনার ক্ষেত্রে তাই নিয়মিত চাকরিকাল, অবসর-উত্তর ছুটি, পূর্বের চাকরিকাল গণনা এবং প্রযোজ্য বিধান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি দপ্তরগুলোর সাম্প্রতিক আদেশেও পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল গণনার বিষয়টি দেখা যায়।

চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৫টি বিষয়

১. ৫ বছর পূর্ণ করার ঘাটতি:
৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ঘাটতিকে ৬ মাসের প্রমার্জনের নিয়মে পূরণ করা যাবে—এমন সাধারণ বিধান নেই।

২. ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর:
পরবর্তী পূর্ণ বছর অর্জনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত ঘাটতি নির্দিষ্ট বিধান সাপেক্ষে প্রমার্জনযোগ্য হতে পারে।

৩. ৬ মাসের বেশি ঘাটতি:
৬ মাসের বেশি ঘাটতি থাকলে এই বিশেষ প্রমার্জনের সীমার মধ্যে পড়বে না।

৪. অবসরের ধরন গুরুত্বপূর্ণ:
স্বাভাবিক অবসর, মৃত্যু, মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে অক্ষমতা, পদ বিলুপ্তির কারণে ছাঁটাই কিংবা স্বেচ্ছা অবসর—সব ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ করা যায় না।

৫. ব্যক্তিগত হিসাবের ক্ষেত্রে নথি যাচাই জরুরি:
চাকরিতে যোগদানের তারিখ, চাকরি স্থায়ীকরণ, বিরতি, ছুটি, পূর্বের চাকরিকাল এবং অবসরের ধরন যাচাই না করে শুধু মোট বছর-মাস দেখে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল নির্ধারণ করা উচিত নয়।

শেষ কথা

পেনশনযোগ্য চাকরিকালে ঘাটতি প্রমার্জনের বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ঘাটতি এবং ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পরবর্তী পূর্ণ বছর অর্জনের ঘাটতি। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত ঘাটতি প্রমার্জনের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু এটি স্বয়ংক্রিয় সুবিধা নয়; সংশ্লিষ্ট বিধান, অবসরের ধরন এবং ব্যক্তির চাকরিকালের নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তাই ২৪ বছর ৬ মাস চাকরিকাল দেখলেই সবার ক্ষেত্রে ২৫ বছর ধরে পেনশন নির্ধারণ হবে—এমন নয়; আবার ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগের ঘাটতিকেও একইভাবে প্রমার্জন করা যাবে না। এই পার্থক্যটিই পেনশনপ্রত্যাশী সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *