নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০২৬ । জেলা পর্যায়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অসাধারণ ছুটি মঞ্জুরি কখন?

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ ২০২৬’ জারি করেছে অর্থ বিভাগ। এই আদেশের ২০ নম্বর নির্দেশনায় নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে কোনো কর্মচারীকে অনূর্ধ্ব ১ বছরের অসাধারণ ছুটি মঞ্জুরির ক্ষেত্রে বিভাগীয় বা সমমান কার্যালয়ের প্রধানদের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে—মঞ্জুরকারীকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ‘নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ’ হতে হবে।

সমস্যার মূলে যে অসংগতি

আদেশ অনুযায়ী, বিভাগীয় প্রধানদের এই ক্ষমতা অর্পণ করা হলেও জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি কোনো ক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাই (যেমন: সিভিল সার্জন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বা সমমান) তাদের দপ্তরের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য প্রকৃত ‘নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আইনত, কোনো কর্মকর্তা যদি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হন, তবে সেই পদের শৃঙ্খলা, ছুটি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাথমিক ক্ষমতা তাঁরই ওপর ন্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু নির্দেশনায় শুধু ‘বিভাগীয়/সমমান কার্যালয় প্রধান’ পর্যন্ত ক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখায় জেলা পর্যায়ের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষরা এই ছুটি মঞ্জুর করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষণ: কে মঞ্জুর করবেন এই ছুটি?

আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশের সাধারণ নিয়ম হলো, যদি কোনো বিশেষ স্তরের ক্ষমতা স্পষ্ট উল্লেখ না থাকে, তবে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় বিবেচনাযোগ্য:

  1. নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার: যেহেতু নির্দেশনায় ‘নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হতে হবে’ শর্তটি বাধ্যতামূলক, তাই জেলা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যদি কোনো পদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হন, তবে তিনিই নীতিগতভাবে মঞ্জুরকারী হওয়ার দাবিদার।

  2. ক্ষমতা পুনঃঅর্পণ (Re-delegation): আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের সাধারণ বিধান অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় প্রধানরা প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে তাদের অর্পিত ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষে অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে পুনঃঅর্পণ করতে পারেন।

প্রয়োজনীয় স্পষ্টীকরণ

বিভাগীয় প্রধানের নিচের স্তরের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে জেলা পর্যায়ের কর্মচারীদের ছোটখাটো অসাধারণ ছুটির জন্যও বিভাগীয় কার্যালয়ে ফাইল পাঠাতে হবে, যা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল চেতনার পরিপন্থী।

তাই সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০২৬-এর ২০ নম্বর নির্দেশনায় একটি ব্যাখ্যা বা সংশোধনী আসা প্রয়োজন। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে—“বিভাগীয় প্রধানের নিম্নস্তরের কোনো কর্মকর্তা যদি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হন, তবে তিনিও অনূর্ধ্ব ১ বছরের অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করতে পারবেন।”


সারসংক্ষেপ: বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও যদি ‘বিভাগীয় প্রধান’ না হন, তবে টেকনিক্যাল কারণে তাঁর এই ক্ষমতা প্রয়োগে আইনি বাধা থাকতে পারে। বিষয়টি স্পষ্ট করতে অর্থ বিভাগ থেকে একটি স্পষ্টীকরণ পরিপত্র জরুরি।

অসাধারণ ছুটি শাস্তি হিসেবে মঞ্জুর করা হয়?

অসাধারণ ছুটি বা Extraordinary Leave (EOL) কোনোভাবেই শাস্তি (Punishment) হিসেবে মঞ্জুর করা হয় না। এটি মূলত একটি বিশেষ ধরনের ছুটি, যা বেতনহীন হলেও চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।

বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে নিচে এর আইনি ও প্রশাসনিক দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

১. অসাধারণ ছুটি কেন দেওয়া হয়?

বিএসআর (BSR Part-1) অনুযায়ী, অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা হয় তখনই যখন:

  • কর্মচারীর অন্য কোনো ছুটি পাওনা না থাকে।

  • ছুটি পাওনা থাকা সত্ত্বেও কর্মচারী লিখিতভাবে অসাধারণ ছুটির জন্য আবেদন করেন।

  • অসুস্থতা, উচ্চশিক্ষা বা বিশেষ ব্যক্তিগত/নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে লম্বা সময়ের প্রয়োজন হয়।

২. শাস্তি এবং ছুটির মধ্যে পার্থক্য

সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা অনুযায়ী শাস্তির তালিকায় ‘অসাধারণ ছুটি’র কোনো অস্তিত্ব নেই। শাস্তির মধ্যে থাকে তিরস্কার, পদাবনতি, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা বা চাকরি থেকে বরখাস্ত।

কখন এটি শাস্তির মতো মনে হতে পারে? মাঝে মাঝে কোনো কর্মচারী বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে (Unauthorized Absence), কর্তৃপক্ষ সেই সময়টিকে চাকরির ছেদ বা ‘Break in Service’ হিসেবে গণ্য না করে দয়াপরবশ হয়ে ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে মঞ্জুর করে অনুপস্থিতিকাল নিয়মিত (Regularize) করে দেন। এটি কর্মচারীকে চাকরি হারানোর হাত থেকে বাঁচানোর একটি প্রশাসনিক কৌশল, শাস্তি নয়। যদিও এই সময়ে কর্মচারী বেতন পান না, তবুও তাঁর চাকরি বজায় থাকে।

৩. অসাধারণ ছুটির আর্থিক প্রভাব

অসাধারণ ছুটিকে অনেকে শাস্তি মনে করেন কারণ:

  • এটি বিনা বেতনে ছুটি।

  • এই ছুটির সময়কাল বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির (Increment) জন্য গণনা করা হয় না (যদি না তা অসুস্থতা বা স্বীকৃত উচ্চশিক্ষার জন্য হয়)।

  • পেনশনের ক্ষেত্রেও এই সময়টি বাদ যেতে পারে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া)।


সারসংক্ষেপ

অসাধারণ ছুটি একটি সুবিধা, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে চাকরি রক্ষার জন্য দেওয়া হয়। এটি কোনো বিভাগীয় দণ্ড বা শাস্তি নয়। কোনো কর্মকর্তা চাইলে নিজ থেকে শাস্তি হিসেবে কাউকে এই ছুটি দিতে পারেন না; এটি কেবল নির্দিষ্ট বিধিবিধানের আলোকেই মঞ্জুর করা হয়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *