২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ২০২৬ । ৯ লাখ কোটির বিশাল পরিকল্পনায় পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাপ ও অনিশ্চয়তা?
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রথমবারের মতো বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট পেশ করার কথা রয়েছে। প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান দাবি ‘নবম পে-স্কেল’ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
পে-স্কেল ও বরাদ্দ নিয়ে ধোঁয়াশা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পে-স্কেলের সুপারিশ করা হলেও নতুন সরকার গঠনের পর এ বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পে-স্কেলের জন্য প্রাথমিকভাবে বরাদ্দকৃত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ফ্যামিলি কার্ড ও জ্বালানি তেলের ভর্তুকিতে ব্যয় করার খবর ছড়িয়ে পড়লে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারি কর্মচারীরা তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছেন।
বাজেটের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার
সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম এই বাজেটে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে:
দারিদ্র্য নিরসন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
মানবসম্পদ উন্নয়ন।
লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
তবে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়সহ বিভিন্ন দফতরে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনই পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। তারা ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান। সাক্ষাৎ শেষে অর্থমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে জানান, দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে নিচে। তিনি বলেন, “পে-স্কেলের সুপারিশ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ পর্যালোচনা না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
কর্মচারীদের হুঁশিয়ারি ও প্রত্যাশা
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, কর্মচারীরা জুলাই মাস থেকেই নতুন স্কেলের বাস্তবায়ন দেখতে চান। তিনি বলেন, “সংসার ঠিকমতো না চললে কর্মচারীরা সেবায় মন দিতে পারেন না। নতুন সরকার হওয়ায় এখনই রাজপথে বড় আন্দোলন না হলেও, স্মারকলিপি প্রদান ও অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করব।”
প্রশাসনের স্থিতিশীলতা বনাম ঝুঁকি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য এই বাজেট ঘোষণা ও পে-স্কেল ইস্যু একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব নজর এখন ১১ জুনের দিকে; সেদিনই স্পষ্ট হবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে নাকি অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
পে স্কেল বর্তমান সরকার কেন দিচ্ছে না?
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার এখনই নতুন পে-স্কেল ঘোষণা না করার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. তীব্র অর্থ সংকট ও বাজেটের টানাপোড়েন
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে সরকারের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও (Tax-GDP Ratio) দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকার এত বড় অংকের বাড়তি ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে।
২. বরাদ্দের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পে-স্কেলের জন্য যে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড (টিসিবি) এবং জ্বালানি তেলের ভর্তুকিতে ব্যয় হয়ে গেছে। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য যে প্রাথমিক তহবিল দরকার ছিল, তা এখন শূন্যের কোঠায়।
৩. বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে সরকারকে আমদানিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বেতন কাঠামোর পরিবর্তন পিছিয়ে যাচ্ছে।
৪. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার
সরকারের বর্তমান প্রধান লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে হঠাৎ করে বিশাল অংকের টাকা (নতুন বেতন আকারে) ঢুকলে পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সরকার নতুন করে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়াতে চাচ্ছে না।
৫. অর্থমন্ত্রীর ‘ধীরে চলো’ নীতি
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট করেছেন যে, পে-স্কেলের সুপারিশগুলো এখনো বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। মোট কত টাকা লাগবে এবং তা দেশের বর্তমান ট্যাক্স রেভিনিউ দিয়ে সামলানো যাবে কি না, তা না দেখে সরকার কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না।
৬. ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার একেবারে নতুন পে-স্কেল না দিয়ে তা ধাপে ধাপে (Phasewise) বাস্তবায়ন করতে পারে। অর্থাৎ, একবারে সব সুবিধা না দিয়ে কয়েক বছরে ভাগ করে বেতন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে বাজেটের ওপর হঠাৎ চাপ না পড়ে।
সংক্ষেপে: টাকার অভাব, ভর্তুকি খাতে বাড়তি ব্যয় এবং বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিরতাই হলো বর্তমান সরকারের পে-স্কেল দিতে দেরি করার মূল কারণ।



