বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস: ২০১৫ বনাম ২০২৬, নতুন পে-স্কেল এখন সময়ের দাবি

গত ১১ বছরে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তার বিপরীতে সাধারণ চাকুরিজীবীদের আয় বাড়েনি বললেই চলে। ২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নতুন কোনো বেতন কাঠামো না আসায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-আয়ের সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবীরা এখন দিশেহারা। বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এসে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাজারের ভয়াবহ চিত্র: ১১ বছরের ব্যবধান

২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চাল, ডাল, তেল ও মশলাসহ প্রতিটি জরুরি পণ্যের দামের তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করলে এক ভয়াবহ সত্য সামনে আসে। তথ্যানুযায়ী:

  • চাল (নাজিরশাইল/সরু): ২০১৫ সালে যে চালের কেজি ছিল ৪০-৪২ টাকা, ২০২৬ সালে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭০-৭২ টাকায়। অর্থাৎ চালের পেছনেই মানুষের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭৫%

  • আটা ও ময়দা: খাদ্য তালিকার অন্যতম প্রধান উপাদান ময়দা ৩০-৩২ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭০-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটার দামও সমান্তরালে বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • মশলার বাজার: সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা গেছে মশলার বাজারে। ২০১৫ সালে ৩০০ টাকায় পাওয়া জিরা এখন ৮০০-৮২০ টাকা। শুকনা মরিচের দাম ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ঠেকেছে ৪০০ টাকায়, যা প্রায় ১৮৫% বৃদ্ধি।

  • অন্যান্য পণ্য: ভোজ্য তেল, ডাল এবং পেঁয়াজের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

আয় ও ব্যয়ের বিশাল ফারাক

২০১৫ সালে যখন সর্বশেষ পে-স্কেল দেওয়া হয়েছিল, তখন জীবনযাত্রার যে মান ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন চাকুরিজীবীর বেতন যদি এই সময়ে সমহারে বৃদ্ধি না পায়, তবে তার প্রকৃত আয় (Real Income) মূলত হ্রাস পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে টাকার মান কমে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ এখন সঞ্চয় তো দূরের কথা, নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে।

কেন নতুন পে-স্কেল জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন ঘোড়দৌড় থামাতে এবং চাকুরিজীবীদের জীবনমান রক্ষা করতে ‘নতুন পে-স্কেল’ বা ‘ মহার্ঘ ভাতা’ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।

১. মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয়: গত ১১ বছরের পুঞ্জীভূত মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে বর্তমান বেতন কাঠামো একেবারেই অপ্রতুল। ২. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: পুষ্টিকর খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মানসম্মত জীবনযাপনের জন্য বেতন বৃদ্ধি অপরিহার্য। ৩. দুর্নীতি রোধ: জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেলে সরকারি ও বেসরকারি খাতে অনৈতিক লেনদেনের প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

উপসংহার

২০১৫ আর ২০২৬ সালের বাজার পরিস্থিতি এক নয়। জ্ঞানের আলোতে সমালোচনা করলে দেখা যায়, নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় সাধারণ মানুষের আয় স্থবির হয়ে আছে। তাই জনজীবন অতিষ্ঠ হওয়ার আগেই সরকারকে বাস্তবসম্মত এবং বাজারবান্ধব একটি নতুন পে-স্কেল নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যম শ্রেণীর একজন কর্মচারী কত বেতন পান?

বাংলাদেশে সরকারি চাকুরিজীবীদের ক্ষেত্রে ‘মধ্যম শ্রেণী’ বলতে সাধারণত ১০ম থেকে ১৩তম গ্রেডের কর্মচারীদের বোঝানো হয় (যারা দ্বিতীয় শ্রেণী বা নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পান)। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী তাদের মূল বেতন এবং আনুমানিক মোট বেতনের একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

সরকারি মধ্যম শ্রেণীর বেতন কাঠামো (১০ম – ১৩তম গ্রেড)

গ্রেডপদের ধরন (উদাহরণ)মূল বেতন (Basic) শুরুমূল বেতন (Basic) শেষআনুমানিক মোট বেতন (শুরুতে)*
১০মউপ-সহকারী প্রকৌশলী, নার্স, পিএস১৬,০০০ টাকা৩৮,৬৪০ টাকা২৭,০০০ – ৩০,০০০+ টাকা
১১তমপ্রধান সহকারী, হিসাবরক্ষক১২,৫০০ টাকা৩০,২৩০ টাকা২১,০০০ – ২৩,০০০+ টাকা
১২তমউচ্চমান সহকারী১১,৩০০ টাকা২৭,৩০০ টাকা১৯,০০০ – ২১,০০০+ টাকা
১৩তমবড় সহকারী, টেকনিশিয়ান১১,০০০ টাকা২৬,৫৯০ টাকা১৮,৫০০ – ২০,০০০+ টাকা

বেতন নির্ধারণের মূল বিষয়গুলো:

  • বাড়ি ভাড়া: মূল বেতনের ৪৫% থেকে ৭০% (ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য মফস্বল এলাকার ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়)।

  • চিকিৎসা ভাতা: মাসিক ১,৫০০ টাকা (স্থির)।

  • যাতায়াত ও টিফিন: গ্রেড অনুযায়ী ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

  • ইনক্রিমেন্ট: প্রতি বছর মূল বেতনের ৫% হারে বেতন বৃদ্ধি পায়। ফলে ২০১৫ সালে যারা চাকরিতে ঢুকেছেন, ২০২৬ সালে এসে তাদের মূল বেতন ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেকটা বেড়েছে।

  • শিক্ষা সহায়ক ভাতা: সন্তান থাকলে প্রতি সন্তানের জন্য ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য ১,০০০ টাকা)।

বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তবতা:

আপনি যে দ্রব্যমূল্যের চার্টটি দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী একজন ১১তম বা ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ২১,০০০ – ২৩,০০০ টাকা বেতন দিয়ে বর্তমান বাজারে ঢাকা বা বড় শহরে সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চাল, তেল এবং মশলার দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে বেতনের বড় অংশই চলে যায় খাদ্যের পেছনে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *