১১ বছর পর আসছে নতুন পে-স্কেল: ৩ ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, বরাদ্দ ৩৭ হাজার কোটি টাকা
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের জন্য প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একবারে কার্যকর না করে, তা আংশিক ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে।
৩ ধাপে বাস্তবায়ন হবে নবম পে-স্কেল
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোটি মোট তিনটি অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে:
প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন বেসিক (মূল) বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা এই ধাপে সুবিধা পাবেন।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ প্রদান করা হবে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): সব ধরনের ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হবে।
কমিশনের মূল হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণ পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়নে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। তবে বর্তমানে চালু থাকা ১০ শতাংশ মহার্ঘভাতা নতুন কাঠামোর সাথে সমন্বয় করায় ব্যয় কমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
সুপারিশের বড় অংশ কাটছাঁট
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন বেতন কাঠামোতে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিল। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী মোট বাস্তবায়ন ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও, পরবর্তীতে গঠিত ‘সচিব কমিটি’র পর্যালোচনায় তা কাটছাঁট করে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে কুক, মালি, গাড়ি সংক্রান্ত ভাতা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিছু সুবিধা অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে সচিব কমিটি। তবে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে:
| গ্রেড | বিদ্যমান বেতন (টাকা) | প্রস্তাবিত নতুন বেতন (টাকা) | সর্বোচ্চ সীমা (ধাপে ধাপে বৃদ্ধি) |
| ১ম গ্রেড (সর্বোচ্চ) | ৭৮,০০০ | ১,৬০,০০০ | – |
| ২য় গ্রেড | – | ১,৩২,০০০ | ১,৫৩,০০০ |
| ৩য় গ্রেড | – | ১,১৩,০০০ | ১,৪৮,০০০ |
| ১০ম গ্রেড | – | ৩২,০০০ | ৭৭,৩০০ |
| ২০তম গ্রেড (সর্বনিম্ন) | ৮,২৫০ | ২০,০০০ | ৪৮,৪০০ |
পেনশন ও বিভিন্ন ভাতার নতুন সুপারিশ
কমিশনের প্রতিবেদনে শুধু বেতন নয়, বরং পেনশন ও অন্যান্য ভাতাতেও বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে:
পেনশন বৃদ্ধি: ২০ হাজার টাকার কম পেনশনে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা: ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য ভাতা: প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ রয়েছে।
পটভূমি ও জনমত
সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর নতুন পে-স্কেল কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্মূল্যায়নের কারণে সরকার এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশনের এই প্রতিবেদন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনটি তৈরির আগে একটি অনলাইন জরিপের মাধ্যমে দেশের ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছিল। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জীবনমান বিবেচনা করেই কমিশন এই সুপারিশমালা প্রণয়ন করে।
সরকারি সূত্র আরও জানিয়েছে, সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতন কমিশনের কাজও এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
সূত্র: আরটিভি


