নবম পে স্কেল নিয়ে উৎকণ্ঠা চরমে : বাজেটে কি থাকছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ?
দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখা গেলেও অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন পে স্কেলের জন্য ৩০ থেকে ৩৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও সরকারিভাবে এখনো কোনো স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় উদ্বেগ বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে।
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন বলছে, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে এখন পর্যন্ত যত তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, তার অধিকাংশই গণমাধ্যমনির্ভর। অর্থ মন্ত্রণালয়, পে কমিশন কিংবা সরকারের দায়িত্বশীল কোনো মহল থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ১ জুলাই থেকে পে স্কেল বাস্তবায়ন আদৌ শুরু হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আবদুল মালেক বলেন, সরকার বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিং দিলেও পে স্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
তার ভাষায়, “মনের ভেতরে একটা ভয় থেকেই যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বা অর্থসচিবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা পাইনি। এজন্য কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে যে আসলেই পে স্কেল হচ্ছে কি না।”
তিনি আরও বলেন, “১১ বছর ধরে আমরা নতুন পে স্কেলের অপেক্ষায় আছি। বর্তমান সরকারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পে স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলেছিল। এখন বাজেট সামনে, তাই আমরা প্রত্যাশা করছি কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হবে।”
প্রথম ধাপেই শতভাগ বেসিক বাস্তবায়নের দাবি
নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন (বেসিক) কার্যকরের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত এক দশকের বেশি সময়ে কর্মচারীদের বেতনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলেও দ্রব্যমূল্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক সরকারি কর্মচারীকে অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় চাকরির মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংগঠনের নেতারা বলেন, অতীতের পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে সম্পূর্ণ বেসিক এবং দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হচ্ছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর।
- দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ বেসিক কার্যকর।
- তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সব ধরনের ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা চালু।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ধারণা করছে।
বাজেটেই মিলবে চূড়ান্ত ইঙ্গিত
আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সেদিন পে স্কেল বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসার সম্ভাবনা কম বলে জানা গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ওই দিনই নতুন পে স্কেলের জন্য কত টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা কী হবে— সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
দ্রব্যমূল্যের চাপে বেতন সংস্কারের দাবি জোরালো
অর্থনীতিবিদ ও চাকরিজীবী প্রতিনিধিদের মতে, ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর গত এক দশকে দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
এ অবস্থায় নতুন পে স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান ও কর্মোদ্যম বজায় রাখার জন্যও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রত্যাশা ও শঙ্কার মাঝামাঝি সরকারি চাকরিজীবীরা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদ রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে বাস্তবায়নের ধরন ও সময় নিয়ে শঙ্কা। বিশেষ করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
তবে বাজেটে যদি প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই সুগম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সরকারি চাকরিজীবীদের দৃষ্টি আগামী ১১ জুন ঘোষিতব্য জাতীয় বাজেটের দিকে, যেখানে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বেতন কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে।
Source: Kaler Kantha


