৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষকদের ঋণের বোঝা: বেতন শেষ, ঋণ শুরু—কবে মিলবে মুক্তি?

সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয়, বাসা নির্মাণ, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে দেশের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিতে হচ্ছে একের পর এক ঋণ। একটি ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আবার নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে অনেক শিক্ষক আজ কার্যত ‘ঋণের চক্রে’ আটকা পড়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষকরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তাদের বেতন দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। এর সঙ্গে সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যুক্ত হওয়ায় বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণ, সমবায় ঋণ কিংবা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে হচ্ছে। কিন্তু মাস শেষে বেতনের বড় একটি অংশ কিস্তি পরিশোধে চলে যাওয়ায় সংসার চালাতে আবারও ঋণের দ্বারস্থ হতে হয়।

ঋণ থেকে ঋণ—এক অন্তহীন চক্র

অর্থনীতিবিদদের মতে, যখন কোনো পরিবারের নিয়মিত আয় প্রয়োজনীয় ব্যয়ের তুলনায় কম থাকে, তখন ঋণ একটি সাময়িক সমাধান দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক বর্তমানে ঠিক এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে শিক্ষক পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।

সন্তানদের শিক্ষাই বড় চাপ

অনেক শিক্ষক জানান, নিজের সন্তানের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে তাদের বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। উচ্চশিক্ষার ব্যয়, কোচিং, আবাসন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে অনেকেই শিক্ষা ঋণ বা ব্যক্তিগত ঋণ নিতে বাধ্য হন।

অন্যদিকে পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয়ও বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করে। সরকারি চিকিৎসা ভাতা বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় খুবই সীমিত হওয়ায় অনেক শিক্ষককে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ জোগাড় করতে হয়।

বেতনের বড় অংশ চলে যায় কিস্তিতে

শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, মাসের শুরুতে বেতন ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পরপরই ঋণের কিস্তি কেটে নেওয়া হয়। ফলে হাতে যে অর্থ থাকে, তা দিয়ে পুরো মাসের সংসার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত আর্থিক সমস্যা নয়; বরং শিক্ষকদের আর্থিক অনিরাপত্তা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। একজন শিক্ষক যখন প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তায় থাকেন, তখন তার পক্ষে শিক্ষাদানে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন

বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলক কম বেতন পান। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও বেতন ও ভাতা কাঠামোর কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় শিক্ষকরা আর্থিক চাপে রয়েছেন।

শিক্ষক নেতারা মনে করেন, নিম্নগ্রেডের সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বাস্তবমুখী বেতন কাঠামো, মূল্যস্ফীতিভিত্তিক সমন্বয় এবং সহজ শর্তে কল্যাণমূলক ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।

উপসংহার

জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে পরিচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আজ অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ঋণ নিয়ে জীবনযাপন, কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং সীমিত বেতনের বাস্তবতা তাদের জীবনে নতুন সংকট তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘ঋণের চক্র’ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *