ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে নবম পে-স্কেল, আগামী বাজেটে বরাদ্দ ৩৫ হাজার কোটি টাকা
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কমিশনের সুপারিশকৃত নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ পরবর্তী অর্থবছরে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে পূর্ণাঙ্গ বেতন-ভাতা কার্যকর করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং বাজেট ঘাটতির কারণে সরকার এক ধাপে পুরো বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে তা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তব্যে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
গত ১৭ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না পৌঁছানোয় সরকারকে বিভিন্ন খাতে ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেও সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। অথচ নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, সুপারিশ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। সেক্ষেত্রে মোট ব্যয় দাঁড়াত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।
বেতন কমিশনের সুপারিশ
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়।
প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশ অনুযায়ী—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব।
- সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ।
- মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য পৃথক বিশেষ ধাপ সৃষ্টির প্রস্তাব।
- নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর সুপারিশ।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তিন ধাপে বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাজেটসংক্রান্ত বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয় এবং তিন ধাপের বাস্তবায়ন পরিকল্পনার প্রতি সম্মতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত ২১ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- ২০২৬-২৭ অর্থবছর: নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর।
- ২০২৭-২৮ অর্থবছর: অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর।
- ২০২৮-২৯ অর্থবছর: ভাতাসহ পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন।
পেনশনভোগীরাও পাচ্ছেন সুবিধা
নবম বেতন কমিশন শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নয়, পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের সুবিধার সুপারিশ করেছে।
সুপারিশে বলা হয়েছে—
- মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
- ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
- ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীরা মাসিক ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীরা ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের নিচের পেনশনভোগীরা ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতিতে একবারে পুরো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, সরকারের ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই মত দিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারও। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকেই সরকার পূর্ণাঙ্গ নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করবে।
রাজস্ব আহরণই হবে মূল চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশে নির্ভর করবে সরকারের রাজস্ব আহরণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর। তাই আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই হবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



