৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে স্কেলে ইনক্রিমেন্টের নিয়মে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব, গ্রেডভেদে ভিন্ন হতে পারে বেতন বৃদ্ধির হার

সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেল ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধির হার। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর খসড়ায় সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একই হারে ইনক্রিমেন্ট না রেখে গ্রেডভেদে ভিন্ন হার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করা, আর্থিক প্রভাব পর্যালোচনা, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট প্রকাশে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।

নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি হলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতনের প্রায় ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলে উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক হারে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কোন গ্রেডে কত শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।

পঞ্চম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্টের হার মূল বেতনের ৪ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্টের হার আরও কমিয়ে মূল বেতনের ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার আলাদাভাবে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট হার চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। বিপরীতে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কম হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল বেতনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় উচ্চ গ্রেডে একই হারে ইনক্রিমেন্ট দিলে টাকার অঙ্কে বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান দ্রুত বাড়ে। এ কারণে বেতন বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি বেতন ব্যয় সামঞ্জস্যে রাখতে গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে।

চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা করার প্রস্তাব

নবম জাতীয় পে স্কেলের খসড়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের চিকিৎসা ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাবও রয়েছে।

জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার কথা বলা হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় তা কমিয়ে ৩ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমান চিকিৎসা ভাতার তুলনায় প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ বেশি হলেও বেতন কমিশনের সুপারিশের তুলনায় তা কম।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মূল্যস্ফীতি ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো। নতুন বেতন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত কত টাকা নির্ধারণ করা হবে, তা গ্যাজেট প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

শিক্ষা ভাতা হতে পারে ১ হাজার ৫০০ টাকা

সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানদের শিক্ষা ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বেতন কমিশনের সুপারিশে শিক্ষা ভাতা ২ হাজার টাকা করার কথা থাকলেও খসড়া পরিকল্পনায় তা ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কমিশনের সুপারিশের তুলনায় ভাতার পরিমাণ কমানো হলেও বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে শিক্ষা ভাতা পাচ্ছেন, তার তুলনায় নতুন হার বেশি হবে।

তবে শিক্ষা ভাতা সন্তানের সংখ্যা অনুযায়ী দেওয়া হবে কি না, সর্বোচ্চ কতজন সন্তানের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে এবং চাকরিজীবীদের সব গ্রেডে একই হারে দেওয়া হবে কি না—এসব বিষয় চূড়ান্ত গ্যাজেট প্রকাশের পর পরিষ্কার হবে।

কয়েক ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে নবম পে স্কেল

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে নবম জাতীয় পে স্কেলের সব সুবিধা একই সঙ্গে কার্যকর না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হতে পারে। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শুরুতে সংশোধিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

পরবর্তী ধাপে চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভাতাসহ কয়েকটি নতুন বা বর্ধিত সুবিধা ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হতে পারে।

কেন ভাতার পরিমাণ কমানো হচ্ছে

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। বিশেষ করে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হলে বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য বেতননির্ভর আর্থিক সুবিধার ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।

এ কারণে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব পরিস্থিতি ও বাজেট সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে বেতন কমিশনের কিছু সুপারিশ সংশোধন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

মূল বেতন বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কয়েকটি ভাতা কমিশনের সুপারিশের তুলনায় কম নির্ধারণ এবং কিছু সুযোগ-সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা

গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থা কার্যকর হলে ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।

এই গ্রেডগুলোর কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখার প্রস্তাব থাকলেও উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তা ধাপে ধাপে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে দীর্ঘমেয়াদে নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

তবে শুধু ইনক্রিমেন্টের শতকরা হার দিয়ে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। নতুন পে স্কেলে প্রতিটি গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন, সর্বোচ্চ বেতনসীমা, ধাপের সংখ্যা এবং অন্যান্য ভাতা নির্ধারণের পরই কোন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকৃতপক্ষে কতটা লাভবান হবেন, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে অপেক্ষা গ্যাজেটের

নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও ইনক্রিমেন্ট, চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এসব বিষয় এখনো প্রস্তাব ও খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।

সরকারি গ্যাজেট বা অর্থ বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে এসব প্রস্তাব পরিবর্তন, সংশোধন কিংবা বাতিলও হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ গ্যাজেট প্রকাশ করা হতে পারে।

চূড়ান্ত গ্যাজেট প্রকাশের পরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন, গ্রেডভিত্তিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, চিকিৎসা ও শিক্ষা ভাতা, কার্যকরের তারিখ, বকেয়া সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যাবে।

এ কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্যাজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অপ্রমাণিত তথ্যের পরিবর্তে অর্থ বিভাগ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *