৯ম পে স্কেল বাস্তবায়নে বৈশ্বিক চাপ ২০২৬ : টাকার উৎস ও সক্ষমতা জানতে চাইল আইএমএফ?
সরকারি চাকুরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত ৯ম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এবার যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। নতুন এই পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের উৎস, সরকারের অর্থায়ন সক্ষমতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি। ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন ঋণ প্যাকেজ অনুমোদনের আগেই সরকারের কাছ থেকে এই ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।
আইএমএফের মূল উদ্বেগ ও প্রশ্ন
আইএমএফ মূলত দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে কয়েকটি বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে:
রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা: দেশে কর-জিডিপি (Tax-GDP) অনুপাত বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে চরম খেলাফি ঋণ ও সামগ্রিক আর্থিক খাতের নিম্নমুখী সূচক নিয়ে সংস্থাটি চিন্তিত।
মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতি: দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই সময়ে সরকার কীভাবে এই বিশাল অতিরিক্ত ব্যয় বহন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, যথাযথ উৎসের সংস্থান ছাড়া এই ব্যয় মেটাতে গেলে বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আগামী ১২ জুলাই আইএমএফ প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফর
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আগামী ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফ-এর বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইবা ক্রুসনারীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করবে। সফরের প্রথম দিনই অর্থ বিভাগের সাথে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে দ্বিতীয় বৈঠকের পুরো সময় জুড়ে থাকবে ৯ম পে স্কেল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং এ খাতে বাজেট বরাদ্দের নিবিড় পর্যালোচনা।
সরকারের অবস্থান ও খরচের হিসাব
চলতি বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ম পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা ধরা হয়েছে।
প্রাথমিক ব্যয়: চলতি অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে এই পে স্কেল চালুর জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন হবে, যা বাজেটের ‘অপ্রত্যাশিত ব্যয়’ খাতে রাখা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ব্যয়: তবে কারিগরি জটিলতা কাটিয়ে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি জরিপের চিত্র
আইএমএফ-এর এই নজরদারির বিপরীতে সরকারি বিভিন্ন জরিপ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ এর তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
বিবিএস-এর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে একটি সাধারণ পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫,০৩১ টাকা। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এই ব্যয় ৪৬,৮৭৭ টাকা এবং ছয় সদস্যের পরিবারের ক্ষেত্রে তা ৬৬,০০০ টাকারও বেশি।
অন্যদিকে, ১১ বছর আগে নির্ধারিত সর্বনিম্ন স্কেলের ৮,২৫০ টাকা বেতন দিয়ে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সরকারি কর্মচারীদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকুরীজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৯.৫% মানুষ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ৯০% মানুষ ফিক্সড ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতির বদলে মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
গ্যাজেট প্রকাশে বিলম্বের কারিগরি কারণ
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াও পে স্কেলের গ্যাজেট প্রকাশে কিছু কারিগরি কারণে বিলম্ব হচ্ছে। এটি কোনো নীতিগত বিলম্ব নয় বলে জানানো হয়েছে। বিলম্বের প্রধান কারণগুলো হলো: ১. বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য করা। ২. হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ও নতুন সফটওয়্যার হালনাগাদ করা। ৩. পেনশন পুনঃনির্ধারণের জটিলতা সমাধান করা।
কর্মচারীদের মধ্যে শঙ্কা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
দীর্ঘদিন পর পে স্কেলটি যখন একটি নির্দিষ্ট টাইমফ্রেমে চলে এসেছিল, ঠিক তখনই আইএমএফ-এর এই হস্তক্ষেপ সরকারি কর্মচারীদের মনে নতুন করে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে (iBAS++) ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা হলে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব। এখন সবার চোখ ১২ জুলাইয়ের আইএমএফ বৈঠকের দিকে—সেখান থেকে নতুন কোনো শর্ত আসে নাকি পে স্কেল বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত মেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।



