আয়কর । ভ্যাট । আবগারি শুল্ক

কমিটির সম্মানী ভাতায় ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে বিভ্রান্তি: উৎসে কর ২০%, ভ্যাট কর্তন হবে কি না?

২০২৬-২৭ অর্থবছর শুরু হওয়ার পর সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কমিটি—বিশেষ করে দরপত্র আহ্বানের জন্য অফিসিয়াল প্রাক্কলন প্রস্তুত কমিটি, মূল্যায়ন কমিটি, ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটি এবং অন্যান্য সভায় অংশগ্রহণকারী সদস্যদের সম্মানী ভাতা থেকে উৎসে কর (TDS) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/VDS) কর্তন নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং হিসাবরক্ষণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফোরামে দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের সম্মানীর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান কেবল ২০ শতাংশ উৎসে কর কেটে বিল পরিশোধ করছে, আবার কোথাও ১৫ শতাংশ ভ্যাটও কর্তন করা হচ্ছে। ফলে বিল প্রস্তুতকারী ও কর্তনকারী কর্মকর্তারা অনিশ্চয়তায় পড়ছেন।

উৎসে কর ২০ শতাংশ

আয়কর আইন, ২০২৩ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কার্যকর উৎসে কর হার অনুযায়ী সভার সম্মানী, প্রশিক্ষণ ফি, মিটিং ফি বা অনুরূপ সম্মানীর ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ২০ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ সম্মানী প্রদানকারী কর্তৃপক্ষকে বিল পরিশোধের আগে নির্ধারিত হারে আয়কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

ভ্যাট কি সব সম্মানীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

এখানেই মূল বিভ্রান্তি।

ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের সম্মানীর ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট প্রযোজ্য নয়। ভ্যাট প্রযোজ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সেবা ভ্যাট আইনের কোন সেবা কোডের আওতায় পড়ে তার ওপর।

বিশেষভাবে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের (Board of Directors) সভায় অংশগ্রহণকারী পরিচালকদের সম্মানীর ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য বলে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্দেশনা দিয়ে আসছে। এই সেবাটি এস-০৫৩ (S053) কোডের আওতায় বিবেচিত হয়।

তবে সরকারি অফিসের দরপত্র কমিটি, অফিসিয়াল প্রাক্কলন প্রস্তুত কমিটি বা অনুরূপ প্রশাসনিক কমিটির সম্মানী একই কোডের আওতায় পড়ে কি না—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত নির্দেশনা না থাকায় বাস্তবে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হচ্ছে।

কেন দেখা দিচ্ছে জটিলতা?

হিসাবরক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—

  • অনেক দপ্তর কেবল ২০ শতাংশ উৎসে কর কেটে বিল পরিশোধ করছে।
  • আবার কিছু দপ্তর ২০ শতাংশ উৎসে করের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাটও কেটে নিচ্ছে।
  • কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন, নির্দিষ্ট কোনো সেবা কোডে না পড়লে “অন্যান্য সেবা” হিসেবে ভ্যাট কর্তন করা যেতে পারে।
  • অন্যদিকে অনেক কর্মকর্তা বলছেন, এ ধরনের কমিটির সম্মানীর ওপর ভ্যাট কর্তনের স্পষ্ট আইনি ভিত্তি না থাকায় শুধুমাত্র আয়কর কর্তনই যথেষ্ট।

ফলে একই ধরনের বিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্নভাবে নিষ্পত্তি হওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

স্ক্রিনশট নিয়েও প্রশ্ন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, মোট সম্মানী থেকে ২০ শতাংশ আয়কর কেটে নেট সম্মানী দেখানো হয়েছে এবং সেখানে ভ্যাট শূন্য দেখানো হয়েছে। তবে স্ক্রিনশটটি কোন সফটওয়্যার বা প্রতিষ্ঠানের বিল প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কেবল স্ক্রিনশটকে আইনি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে ভ্যাট কর্তনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই, সেখানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, সিজিএ কার্যালয় অথবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর লিখিত ব্যাখ্যা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা। কারণ ভুলভাবে ভ্যাট কর্তন বা কর্তন না করা—উভয় ক্ষেত্রেই নিরীক্ষায় আপত্তি উঠতে পারে।

উপসংহার

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী কমিটির সম্মানীর ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ উৎসে কর কর্তন বাধ্যতামূলক। তবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সব ধরনের সম্মানীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য—এমন কোনো স্পষ্ট ও সর্বজনীন নির্দেশনা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন কমিটির সম্মানীর বিষয়ে এনবিআরের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা পৃথক নির্দেশনা প্রকাশিত হলে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর হবে এবং কর্তনকারী কর্মকর্তারাও অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাবেন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *