অফিসে অনুপস্থিতি ও অসদাচরণের অভিযোগে সহকারী পরিচালককে চাকরি থেকে অপসারণ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক সহকারী পরিচালককে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য এবং সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য-৪ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মো. রাসেদুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক (সমর্থিক/সমন্বয়িক ব্যবস্থাপনা), আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, রাজশাহী-এর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী বিভাগীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে তাকে চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
যেসব অভিযোগ তদন্তে উঠে এসেছে
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রায়ই দেরিতে অফিসে আসতেন এবং অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন। বিষয়টি নিয়ে পূর্বে তাকে মৌখিকভাবে সতর্কও করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও তার আচরণে পরিবর্তন না আসায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
এছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগ যাচাই করতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের লোকেশন সংক্রান্ত তথ্য জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC) থেকে সংগ্রহ করা হয়।
লোকেশন তথ্যেও মিলেছে অনুপস্থিতির প্রমাণ
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, লোকেশন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—
- ১ নভেম্বর ২০২২ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত মোট ১৮৯ কর্মদিবসের মধ্যে ১১৯ দিন তিনি কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
- বাকি ৭০ দিন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে ১৭ আগস্ট ২০২৩ তারিখে তাকে বরগুনা থেকে রাজশাহীতে বদলি করা হলেও দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে ১৬ অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—
- মোট ১৪৮ কর্মদিবসের মধ্যে মাত্র ৭০ দিন পূর্ণদিবস এবং ৩৯ দিন অর্ধদিবস কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
- অবশিষ্ট ৩৯ দিন অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন।
দুই কর্মস্থলের হিসাব একত্রে বিবেচনায় নিয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিনি বরগুনায় ৭০ দিন এবং রাজশাহীতে ১৩০ দিন, অর্থাৎ মোট ২০০ কর্মদিবস কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন।
বিভাগীয় কার্যক্রম যেভাবে সম্পন্ন হয়
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ অভিযোগে বিভাগীয় মামলা শুরু করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায়—
- কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
- তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেন।
- ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়।
- তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
- তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ সমর্থিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়।
- পরে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশও জারি করা হয়।
- তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ বহাল রাখা হয়।
সরকারি কর্ম কমিশনের মতামতও নেওয়া হয়
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধান এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) রেগুলেশনস, ১৯৭৯ অনুসারে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের কাছে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন মতামত দেয় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘চাকরি হতে অপসারণ’ শাস্তি আরোপ করা যেতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সবশেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অভিযোগটি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এবং বিধি ৪(৩)(গ) অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
উল্লেখযোগ্য দিক
এই ঘটনায় সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি, দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে। একই সঙ্গে তদন্তে মোবাইল ফোনের লোকেশন তথ্যসহ প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ ব্যবহারের বিষয়টিও প্রজ্ঞাপনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।



