৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে স্কেলে নতুন মোড়: গেজেটের আগে সুপারিশে কাটছাঁটের ইঙ্গিত, বাস্তবায়ন নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের সরকারি ঘোষণা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার নতুন আশা জাগিয়েছিল। তবে বাজেট ঘোষণার এক মাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখনো গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় বাস্তবায়নের সময়সূচি ও কাঠামো নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বেতন কমিশনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশে পরিবর্তন আনার আলোচনা শুরু হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার এখনো নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। তবে এটি কত ধাপে কার্যকর হবে, কমিশনের সুপারিশ কতটুকু গ্রহণ করা হবে এবং আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কী ধরনের কাঠামো নির্ধারণ করা হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ কারণেই গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তিন ধাপ থেকে দুই ধাপের আলোচনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

জাতীয় বেতন কমিশন প্রাথমিকভাবে নবম পে স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল।

কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • প্রথম ধাপে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করার কথা বলা হয়।
  • দ্বিতীয় ধাপে, ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ ছিল।
  • তৃতীয় ধাপে, ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা, আনুষঙ্গিক সুবিধা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা শুরু করে। কর্মকর্তাদের মতে, চলতি বছরের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে অনেক সরকারি কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে নতুন প্রস্তাবিত মূল বেতনের মাত্র ৫০ শতাংশ কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে খুব কম হবে। এতে একই গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়নের বিকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গেজেট প্রকাশে কেন বিলম্ব?

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার এমন একটি পে স্কেল চায় যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা বা বৈষম্যের সৃষ্টি না হয়। এজন্য অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বিদ্যমান বেতন কাঠামো, ইনক্রিমেন্টের প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়—সবকিছু বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

এ কারণেই গেজেট প্রকাশের আগে কমিশনের কিছু সুপারিশ সংশোধনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, গেজেট প্রকাশের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকবে। ফলে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সরকার আরও পর্যালোচনা করছে।

বাজেটে অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট বরাদ্দের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা

অন্যদিকে জনপ্রশাসন খাতে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, এই বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে চলতি অর্থবছরের প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি। ফলে রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক ঋণ, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও সময়সূচি।

আইএমএফ কী বলছে?

গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে নতুন পে স্কেলের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে আইএমএফ কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায়নি।

অর্থাৎ, আইএমএফ সরাসরি পে স্কেল বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। তবে সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাজেট ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কমিশনের প্রস্তাবে কী ছিল?

২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ব্যাপক পরিবর্তনের সুপারিশ করে।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী—

  • মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
  • সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
  • সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
  • বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশও করা হয়।

তবে এই সুপারিশের সবকিছু সরকার হুবহু গ্রহণ করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বাড়ছে অপেক্ষা

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

বিশেষ করে বাস্তবায়নের ধাপ, বেতন বৃদ্ধির হার, ভাতা কার্যকর হওয়ার সময় এবং কমিশনের সুপারিশে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার কোনো ধরনের ত্রুটি বা প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই পে স্কেল কার্যকর করতে চায়। তাই সব দিক বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশ্লেষণ

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নবম পে স্কেল বাতিল হচ্ছে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং বাস্তবায়নের কাঠামো ও ধাপ নিয়ে সরকার নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজেট ঘাটতি, ইনক্রিমেন্টজনিত বেতন কাঠামোর পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় কমিশনের কিছু সুপারিশ সংশোধিত হতে পারে।

তবে সরকারি গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের ধাপ কিংবা কার্যকর হওয়ার চূড়ান্ত সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গেজেট প্রকাশ এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *