সেপ্টেম্বর থেকে আয়কর রিটার্নে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য
ব্যক্তি করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করতে ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য আয়কর রিটার্নের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও কারিগরি কার্যক্রম শেষ হলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই এ সুবিধা চালু হতে পারে বলে জানা গেছে।
নতুন ব্যবস্থায় করদাতাকে আয়কর রিটার্নে ব্যাংক হিসাবের তথ্য হাতে লিখে বা ম্যানুয়ালি সংযুক্ত করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হবে না; করদাতার ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে।
ব্যাংক হিসাবের চার ধরনের তথ্য যুক্ত হতে পারে
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একজন করদাতার ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আয়কর রিটার্নের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- আয়বর্ষের সর্বশেষ দিনে ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের পরিমাণ;
- ব্যাংক হিসাব থেকে অর্জিত সুদ বা অন্যান্য আয়;
- ব্যাংক হিসাব থেকে কর্তন করা উৎসে করের পরিমাণ;
- ব্যাংক কর্তৃক নেওয়া সার্ভিস চার্জের তথ্য।
এতে করদাতাকে এসব তথ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করে রিটার্নে সংযুক্ত করার ঝামেলা কমবে। একই সঙ্গে আয়কর রিটার্নের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও এনবিআরের কাজ সহজ হবে।
সেপ্টেম্বরে চালুর লক্ষ্যে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে এনবিআরের আলোচনা শেষ হয়েছে। কীভাবে ব্যাংকগুলো নিরাপদ ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে তথ্য শেয়ার করবে, সে বিষয়ে কারিগরি বিষয়গুলোও ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়েছে।
চলতি মাসে কারিগরি কার্যক্রম শেষ করার পর সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর রিটার্নে যুক্ত করার ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।
এর ফলে করদাতাকে ব্যাংক হিসাবের তথ্য আলাদাভাবে লিখে রিটার্নে সংযুক্ত করতে হবে না। এতে সময় ও শ্রম দুটিই সাশ্রয় হবে এবং রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য না দিলে কী হবে?
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য আয়কর রিটার্নে যুক্ত করার সুযোগ থাকলেও এটি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেই বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো করদাতা চাইলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসাবের তথ্য যুক্ত করতে পারবেন, আবার না চাইলে প্রচলিত পদ্ধতিতেও রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।
তবে যেসব করদাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য রিটার্নে যুক্ত করবেন না, তাদের রিটার্ন তুলনামূলক অডিট বা যাচাইয়ের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
ব্যাংক হিসাবের তথ্য আয়কর রিটার্নের সঙ্গে যুক্ত হলে করদাতাদের মধ্যে গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক হিসাবে কত টাকা রয়েছে, কত সুদ পাওয়া গেছে বা কত উৎসে কর কাটা হয়েছে—এসব তথ্য ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনে এনবিআরের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাংক হিসাবের তথ্য রিটার্নের সঙ্গে যুক্ত হলেও তা গোপনীয় থাকবে। করদাতা নিজেই তার ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন। ব্যাংক হিসাবের তথ্য কীভাবে নিরাপদভাবে আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কারিগরি আলোচনা হয়েছে।
বিনিয়োগ ও গাড়ির তথ্যও স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা
শুধু ব্যাংক হিসাব নয়, ভবিষ্যতে করদাতার বিনিয়োগ এবং গাড়ির মালিকানার তথ্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর রিটার্নে যুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বর্তমানে এ তথ্যগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নতুন আইন বা প্রয়োজনীয় আইনি পরিবর্তন ছাড়া এ ধরনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করা সম্ভব নয়। তাই আপাতত ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করার বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
রিটার্ন জমায় কর প্রণোদনাও থাকছে
চলতি করবর্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাদের জন্য প্রণোদনার সুযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নিট প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত করার সুবিধা চালু হলে করদাতারা একই সময়ে সহজ পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের পাশাপাশি নির্ধারিত প্রণোদনার সুবিধাও নিতে পারবেন।
অনলাইন রিটার্নে কারা ছাড় পাবেন
গত কয়েক বছর ধরে ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির করদাতাকে অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাড়প্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন—
- ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের প্রবীণ করদাতা;
- শারীরিকভাবে চ্যালেঞ্জপ্রাপ্ত বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা;
- বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা;
- মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি;
- বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিক।
এ ধরনের করদাতারা নির্ধারিত নিয়মে অনলাইন রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাবেন।
করদাতাদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে
ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর রিটার্নে যুক্ত হলে করদাতাদের রিটার্ন প্রস্তুতের কাজ অনেকটাই সহজ হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক সুদ, উৎসে কর ও হিসাবের স্থিতির মতো তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে এনবিআরও রিটার্নে প্রদর্শিত আয় ও সম্পদের তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাবে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় করদাতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে রিটার্নে প্রদর্শিত আয়, সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা। কারণ স্বয়ংক্রিয় তথ্য সংযুক্তির ফলে রিটার্নে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক তথ্যের অমিল সহজেই শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সব মিলিয়ে, সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংক হিসাবের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল, তথ্যনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে সুবিধাটি চালুর আগে এনবিআরের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা, কারিগরি প্রক্রিয়া এবং করদাতার সম্মতি-সংক্রান্ত নিয়ম প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।



