পে-স্কেল কারও দয়া নয়, কর্মচারীদের অধিকার—বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামোর দাবি
“পে-স্কেল কারো দয়া বা অনুগ্রহে নয়, পে-স্কেল আমাদের অধিকার। বৈষম্যমুক্ত ও রাহুমুক্ত হোক পে-স্কেল”—সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে এমন প্রত্যাশা ও দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য, গ্রেডের ব্যবধান, উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা এবং নিম্ন গ্রেডের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়ে এবার একটি বাস্তবসম্মত ও কর্মচারীবান্ধব বেতন কাঠামোর দাবি সামনে এসেছে।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা—নবম জাতীয় পে-স্কেল যেন কেবল বেতন বৃদ্ধির হিসাব না হয়ে একটি ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতনধাপ পুনর্বিন্যাস, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ আরও যৌক্তিক করা এবং সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার ওপরে উন্নীত করার দাবিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
‘আট আনার জীবন, চার আনার দামে’—অসন্তোষের প্রতীকী ভাষা
কর্মচারীদের বর্তমান প্রত্যাশা ও হতাশাকে অনেকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরছেন—“আট আনার জীবন, চার আনার দামে, দুই আনা নাটকের বাকি—ও পে-স্কেল তোরে পেতে আর কতদিন দেরি।”
এই বক্তব্যের মধ্যে মূলত দীর্ঘ অপেক্ষা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন রয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত সুপারিশ এবং প্রজ্ঞাপন নিয়ে সময় গড়িয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও দেখা গেছে, বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে সচিব কমিটিকে আর্থিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করতে হচ্ছে।
কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি বেতন স্কেল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কমিশনের হিসাবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে।
ফলে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার বেশি করার দাবি মূল কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, সেটিকে আরও বাস্তবসম্মত ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রত্যাশা রয়েছে।
১০ থেকে ২০ গ্রেডে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়ার দাবি
কর্মচারীদের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড। এই স্তরে কর্মরতদের বড় অংশই তাদের বেতন দিয়ে পরিবার পরিচালনা, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটান।
তাই শুধু সর্বনিম্ন বেতন বাড়ালেই হবে না—গ্রেডগুলোর মধ্যকার ধাপও যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান এমন হতে হবে, যাতে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হয়।
কর্মচারীদের দাবি, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতনধাপ দীর্ঘদিনের কাঠামো অনুসরণ করে রাখলে নতুন পে-স্কেলেও পুরোনো বৈষম্যের বড় অংশ থেকে যেতে পারে। তাই নতুন কাঠামোয় প্রতিটি ধাপের মধ্যে যুক্তিসংগত ব্যবধান নির্ধারণ করা জরুরি।
উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতা দূর করার আহ্বান
সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীদের জন্য উচ্চতর গ্রেড একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা। কিন্তু এ সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যাখ্যাগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
এ কারণে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সচিব কমিটির কাছে দাবি উঠেছে—উচ্চতর গ্রেডের বিধানকে স্পষ্ট, সহজ ও কার্যকর করতে হবে।
বিশেষ করে কোনো কর্মচারী দীর্ঘ সময় একই পদে কর্মরত থাকলে শুধু পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকার কারণে যেন তার আর্থিক অগ্রগতি আটকে না থাকে, সে বিষয়টি নতুন কাঠামোয় বিবেচনা করার দাবি রয়েছে।
শুধু বেতন নয়, ‘বেতন কাঠামোর ন্যায়বিচার’ জরুরি
নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু কত টাকা বাড়বে, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে বেতন বৃদ্ধির সুফল কোন গ্রেডে কতটা পৌঁছাবে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সচিব কমিটি বেতন কমিশনের সুপারিশ, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং ভাতা কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। এ কারণেই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এদিকে সচিব কমিটির আলোচনায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের ব্যবধান কমিয়ে ১:৮ থেকে ১:৭.৫ করার প্রস্তাবের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে।
এই অনুপাত আরও যৌক্তিক করার পাশাপাশি নিচের গ্রেডগুলোর ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো না গেলে কাঠামোগত বৈষম্য পুরোপুরি দূর হবে না—এমন মতও রয়েছে।
‘কর্মচারীদের বিন্দুমাত্র ঠকানো যাবে না’
কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সচিব কমিটির সম্মানিত সদস্যদের প্রতি যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, তার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—নতুন পে-স্কেলে কর্মচারীদের বিন্দুমাত্র ঠকানো যাবে না।
অর্থাৎ কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার সময় এমন কোনো পরিবর্তন করা উচিত নয়, যাতে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রত্যাশিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ সংকুচিত করা, গ্রেডের ধাপ অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো কিংবা বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা না করে নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি করার বিরুদ্ধেও সতর্ক থাকার দাবি উঠছে।
কেন এই দাবি গুরুত্বপূর্ণ
একটি বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর সেটি সাধারণত বহু বছর কর্মচারীদের আয়, অবসর সুবিধা এবং বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ফলে নবম পে-স্কেলে সাময়িক হিসাবের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ও উপেক্ষা করা যাবে না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে সচিব কমিটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা
নবম পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছে। তবে কার্যকর তারিখ ও বাস্তবে নতুন বেতন হাতে পাওয়ার সময় এক বিষয় নয়—প্রজ্ঞাপন, প্রশাসনিক আদেশ, সফটওয়্যার ও বেতন নির্ধারণসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণেই কার্যকর তারিখ ঘোষণার পরও বাস্তবায়নে সময় লাগছে।
জুলাইয়ের শেষদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা জানিয়েছেন।
ফলে এখন কর্মচারীদের মূল প্রত্যাশা—আর দীর্ঘসূত্রতা নয়; দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন এবং বাস্তবায়নের কার্যকর রোডম্যাপ।
কর্মচারীদের প্রত্যাশার মূল জায়গাগুলো
বর্তমান দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
- সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকার ওপরে উন্নীত করা;
- ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতনধাপ যুগোপযোগী ও যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা;
- উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ সহজ, স্পষ্ট ও কার্যকর করা;
- গ্রেডগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক বেতন ব্যবধান কমানো;
- মূল্যস্ফীতির বাস্তব প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া;
- কর্মচারীদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা কমিয়ে নয়, বরং ন্যায়সংগতভাবে কাঠামো নির্ধারণ করা;
- নতুন পে-স্কেলে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্যের সুযোগ বন্ধ করা;
- বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করা।
শেষ কথা
নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি লাখ লাখ কর্মচারীর জীবনযাত্রা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাই কর্মচারীদের ভাষায়—“পে-স্কেল কারও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, পে-স্কেল আমাদের অধিকার।”
এই অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে নিচের গ্রেডের কর্মচারীরা দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, উচ্চতর গ্রেড কার্যকর থাকে এবং বেতনধাপগুলো সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
সচিব কমিটির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ—সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও কর্মচারীদের ন্যায্য প্রত্যাশার মধ্যে এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে নবম পে-স্কেল সত্যিকার অর্থেই বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট—
বৈষম্য নয়, সমতা; দীর্ঘসূত্রতা নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন; নামমাত্র বৃদ্ধি নয়, জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন; আর কোনো বঞ্চনা নয়—ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেই হোক নবম পে-স্কেলের যাত্রা।



