চাকরি স্থায়ীকরণ না হলে নতুন সরকারি চাকরিতে স্থায়ীকরণের সময় কোন তারিখ থেকে গণনা হবে?
নিজের পছন্দে এক সরকারি চাকরি ছেড়ে অন্য সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে পূর্বের চাকরির যোগদানের তারিখ থেকেই কি স্থায়ীকরণের সময় গণনা হবে—নাকি নতুন চাকরিতে যোগদানের দিন থেকেই নতুন করে হিসাব শুরু হবে? সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। বিষয়টি বুঝতে হলে ‘পূর্বের চাকরিকাল গণনা’, ‘বেতন সংরক্ষণ’, ‘পেনশনযোগ্য চাকরিকাল’ এবং ‘চাকরি স্থায়ীকরণ’—এই চারটি বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৯ ধারায় শিক্ষানবিসকাল ও চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিধি দ্বারা নির্ধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু পূর্বের চাকরিতে কত বছর কাজ করেছেন—এ তথ্য দিয়ে নতুন পদে স্থায়ীকরণের তারিখ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয় না।
মূল কথা: নতুন নিয়োগ হলে নতুন চাকরির হিসাবই গুরুত্বপূর্ণ
কোনো সরকারি কর্মচারী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নতুন সরকারি পদে সরাসরি নিয়োগ পান, সাধারণত সেই নিয়োগকে ‘নবনিয়োগ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সরকারি নিয়োগসংক্রান্ত বিধি ও সাম্প্রতিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও এ নীতির প্রতিফলন দেখা যায়—পূর্বের চাকরিকাল নির্দিষ্ট সুবিধার জন্য গণনাযোগ্য হলেও জ্যেষ্ঠতা বা অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে তা সবসময় গণনাযোগ্য নয়।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী ১ জানুয়ারি ২০২২ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন। কিন্তু ওই চাকরিতে তার স্থায়ীকরণ এখনো হয়নি। তিনি পরবর্তীতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নতুন একটি সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেলেন এবং ১ জানুয়ারি ২০২৬ সালে নতুন চাকরিতে যোগ দিলেন।
যদি নতুন নিয়োগটি বিধি অনুযায়ী নবনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে নতুন পদের শিক্ষানবিসকাল/স্থায়ীকরণের শর্ত পূরণের হিসাব সাধারণভাবে নতুন চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকেই শুরু হবে। অর্থাৎ পূর্বের চাকরিতে ৪ বছর কাজ করার কারণে নতুন পদে সেই ৪ বছর যোগ করে স্থায়ীকরণের তারিখ পিছিয়ে ২০২২ সাল থেকে ধরা হবে—এমন স্বয়ংক্রিয় নিয়ম নেই।
তাহলে আগের চাকরির সময় একেবারেই কি কাজে আসবে না?
এখানেই বিষয়টি একটু জটিল।
সরকারি চাকরি থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নতুন সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগ পেলে পূর্বের চাকরিকাল কিছু ক্ষেত্রে পেনশন, বেতন সংরক্ষণ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার জন্য গণনাযোগ্য হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পূর্বের চাকরির পুরো সময় নতুন পদে স্থায়ীকরণের শিক্ষানবিসকাল হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে।
সরকারি গেজেটে প্রকাশিত বিধানে এমন কর্মচারীর পূর্বের চাকরিকাল পেনশন/সিপিএফ/গ্র্যাচুইটি-সংক্রান্ত সুবিধার জন্য গণনার কথা রয়েছে; একই সঙ্গে বলা হয়েছে, পূর্বের চাকরিকাল জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে গণনাযোগ্য হবে না।
অর্থাৎ—
পূর্বের চাকরিকাল গণনা করা হচ্ছে = নতুন চাকরিতে স্থায়ীকরণের সময়ও পূর্বের তারিখ থেকে গণনা হবে—এটি ঠিক নয়।
দুটি বিষয় আলাদা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
ধরা যাক—
- প্রথম সরকারি চাকরিতে যোগদান: ১ জুলাই ২০২২
- প্রথম চাকরিতে স্থায়ীকরণ হয়নি
- নতুন সরকারি চাকরিতে যোগদান: ১ আগস্ট ২০২৬
- নতুন পদের নির্ধারিত শিক্ষানবিসকাল: ২ বছর
এক্ষেত্রে যদি নতুন নিয়োগটি ‘নবনিয়োগ’ হিসেবে গণ্য হয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে পূর্বের চাকরিকাল সমন্বয়ের বিশেষ কোনো বিধান না থাকে, তাহলে নতুন পদের স্থায়ীকরণের যোগ্যতার সময় গণনা হবে ১ আগস্ট ২০২৬ থেকে।
অর্থাৎ আগের চাকরিতে ৪ বছর ১ মাস কাজ করেছেন বলে নতুন চাকরিতে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই স্থায়ী হয়ে যাবেন—এমনটি বলা যাবে না।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে
সব সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে একই নিয়ম একভাবে প্রয়োগ করা যাবে না।
কারণ সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ধরন, ক্যাডার/নন-ক্যাডার পদ, সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, পূর্বের চাকরি থেকে কীভাবে অবমুক্ত হয়েছেন এবং নতুন চাকরিতে নিয়োগের আদেশে কী বলা হয়েছে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যদি কোনো কর্মচারী বদলি, পদোন্নতি, চাকরির ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ বা বিশেষ বিধানের অধীনে নতুন পদে যান, তাহলে বিষয়টি সরাসরি নতুন নিয়োগের মতো নাও হতে পারে।
সরকারি বিধিতেও এক চাকরিস্থল থেকে অন্য চাকরিস্থলে বদলি বা পদ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম রয়েছে।
অন্যদিকে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নতুন পদে সরাসরি নিয়োগ পেলে সেটি নবনিয়োগ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ বিধি ও বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়।
‘স্থায়ীকরণ হয়নি’ আর ‘চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরিতে যাওয়া’—দুটি এক বিষয় নয়
অনেকেই মনে করেন, আগের চাকরিতে স্থায়ীকরণ না হলেও যেহেতু তিনি সরকারি চাকরিতে ছিলেন, তাই নতুন চাকরিতে আগের যোগদানের তারিখ ধরে স্থায়ীকরণ করতে হবে।
এ ধারণা সাধারণভাবে নিরাপদ নয়।
কারণ স্থায়ীকরণ হচ্ছে নির্দিষ্ট পদে চাকরির শর্ত পূরণের বিষয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
অতএব, একজন কর্মচারী যদি আগের চাকরি থেকে বের হয়ে নতুন পদে নতুন নিয়োগ হিসেবে যোগ দেন, তাহলে নতুন পদের স্থায়ীকরণের শর্ত নতুন করে প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বেতন সংরক্ষণ ও স্থায়ীকরণকে এক করে দেখা যাবে না
এটি সবচেয়ে বেশি ভুল হওয়ার জায়গা।
নতুন সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় পূর্বের চাকরির কারণে যদি বেতন সংরক্ষণ বা কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, তার অর্থ এই নয় যে নতুন চাকরির স্থায়ীকরণের শিক্ষানবিসকালও আগের চাকরির তারিখ থেকে গণনা হবে।
সরকারি বিধিতে পূর্বের চাকরিকাল পেনশন বা বেতন সংরক্ষণের মতো সুবিধার জন্য গণনার সুযোগ থাকা এবং একই সময়ে জ্যেষ্ঠতা বা অন্য সুবিধায় তা গণনাযোগ্য না হওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
তাই একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি হতে পারে—
পূর্বের চাকরির সময় → পেনশন/বেতন সংরক্ষণের জন্য গণনাযোগ্য
কিন্তু
পূর্বের চাকরির সময় → নতুন পদের স্থায়ীকরণের শিক্ষানবিসকাল হিসেবে গণনাযোগ্য নয়।
চাকরি ছাড়ার আগে যে বিষয়গুলো অবশ্যই যাচাই করবেন
এক সরকারি চাকরি ছেড়ে অন্য সরকারি চাকরিতে যাওয়ার আগে শুধু ‘চাকরি স্থায়ী হয়েছে কি না’—এটি দেখলেই হবে না। বরং নিচের বিষয়গুলো লিখিতভাবে যাচাই করা নিরাপদ—
১. নতুন নিয়োগটি নবনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে কি না।
২. নতুন পদের নিয়োগবিধিতে শিক্ষানবিসকাল কত বছর।
৩. পূর্বের চাকরিকাল নতুন পদে কোনো নির্দিষ্ট কারণে গণনাযোগ্য কি না।
৪. পূর্বের চাকরির বেতন সংরক্ষণ করা যাবে কি না।
৫. পূর্বের চাকরিকাল পেনশনযোগ্য চাকরিকাল হিসেবে গণনার সুযোগ আছে কি না।
৬. নতুন পদে জ্যেষ্ঠতা কীভাবে নির্ধারিত হবে।
৭. আগের চাকরি থেকে অবমুক্তির আদেশে কোনো বিশেষ শর্ত আছে কি না।
৮. নতুন নিয়োগপত্রে পূর্বের চাকরির ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কোনো উল্লেখ আছে কি না।
কেন এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
চাকরি স্থায়ীকরণ শুধু একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে চাকরির বিভিন্ন প্রশাসনিক অধিকার, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা এবং ভবিষ্যৎ চাকরিজীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্পর্ক থাকতে পারে।
সরকারি দপ্তরগুলোতে নিয়মিত চাকরি স্থায়ীকরণের আদেশ জারি হচ্ছে—২০২৬ সালেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর চাকরি স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত আদেশ প্রকাশ করেছে।
তাই ‘আগের চাকরিতে স্থায়ী হয়নি, তাই নতুন চাকরিতে আগের যোগদানের তারিখ থেকেই স্থায়ী হবে’—এ ধরনের সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়।
শেষ কথা
সাধারণ নীতিতে, আগের সরকারি চাকরি ছেড়ে নতুন সরকারি চাকরিতে যদি নতুন নিয়োগ হিসেবে যোগদান করেন, তাহলে নতুন চাকরির শিক্ষানবিসকাল/স্থায়ীকরণের সময় নতুন চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকেই গণনা হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
তবে পূর্বের চাকরিকাল একেবারেই অকার্যকর হয়ে যায় না। বিধি ও নিয়োগের ধরন অনুযায়ী তা বেতন সংরক্ষণ, পেনশন বা নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে গণনাযোগ্য হতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধাকে সরাসরি নতুন চাকরির স্থায়ীকরণের তারিখ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।
সুতরাং, কেউ যদি শুধু স্থায়ীকরণ হয়নি বলে আগের সরকারি চাকরি ছেড়ে নতুন সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে নতুন চাকরির নিয়োগবিধি ও নিয়োগপত্র না দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে একই সঙ্গে বেতন সংরক্ষণ, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং স্থায়ীকরণের সময়—এই তিনটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।
সারসংক্ষেপ:
পূর্বের চাকরিতে স্থায়ীকরণ হয়নি + নতুন পদে নতুন নিয়োগ = সাধারণত নতুন চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে স্থায়ীকরণের সময় গণনা।
তবে বিশেষ নিয়োগবিধি, চাকরির ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ বা অন্য কোনো বিধান থাকলে ফল ভিন্ন হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদের নিয়োগবিধি ও নিয়োগ/অবমুক্তির আদেশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল।



