বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

৯ম পে-স্কেলের গেজেটসহ ৯ দফা দাবিতে শুক্রবার প্রতিনিধি সমাবেশ

নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশ ও বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাজধানীতে প্রতিনিধি সমাবেশের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটির প্রচারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, জাতীয় ভিত্তিক সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই জোটের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় আবদুস সালাম হলে বিকেল ৩টায় সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সমাবেশের মূল লক্ষ্য হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে বৈষম্যহীন নবম পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশ ও বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন বেতন, পদ-পদবি, নিয়োগবিধি ও চাকরিসংক্রান্ত বৈষম্য দূর করার দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায় সংগঠনটি।

বর্তমানে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। সর্বশেষ বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে এবং এর আগে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।

যে দাবিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে

সমাবেশের প্রচারপত্রে ৯ দফা দাবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো দ্রুত নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়ন। এর পাশাপাশি টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল, সচিবালয়ের বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্য সচিবালয়ের অনুরূপ পদ ও পদবি নির্ধারণ এবং এক ও অভিন্ন নিয়োগবিধি বাস্তবায়নের দাবিও সামনে এসেছে।

এসব দাবি নতুন নয়। অতীতেও বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ একই ধরনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। ২০২৩ সালের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে নবম পে-স্কেল, ৫০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতা, ১৯৭৩ সালের কাঠামোর আলোকে বেতন নির্ধারণ, সচিবালয়ের সঙ্গে পদ-পদবির বৈষম্য দূর করা, এক ও অভিন্ন নিয়োগবিধি, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল, গ্র্যাচুইটি বৃদ্ধি, আউটসোর্সিং কর্মীদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর এবং ভাতা পুনর্নির্ধারণের মতো বিষয় ছিল।

পে-স্কেল কেন সমাবেশের কেন্দ্রবিন্দু

২০১৫ সালের ৮ম জাতীয় পে-স্কেলের পর দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ নতুন বেতন কাঠামোর প্রত্যাশায় রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের দাবি—বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পুরোনো বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য কমে গেছে।

এ কারণেই ৯ম পে-স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, ভাতা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং বিভিন্ন দপ্তরের পদ-পদবির বৈষম্য নিরসনের বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।

গত মে মাসেও ঐক্য পরিষদ নবম পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল। সে সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দীর্ঘ সময় ধরে নতুন পে-স্কেল না হওয়া এবং মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের আর্থিক চাপ বেড়েছে।

টাইমস্কেল-সিলেকশন গ্রেড কেন গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি কর্মচারীদের অন্যতম দীর্ঘদিনের দাবি হলো টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল। এসব ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি মূলত একই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকা কর্মচারীদের আর্থিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ঐক্য পরিষদের আগের দাবিতেও টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও বেতন জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহালের বিষয়টি ছিল। সংগঠনটির যুক্তি, দীর্ঘ চাকরিজীবনে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ না থাকলে কর্মচারীদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য আরও বাড়ে।

সচিবালয় ও অন্যান্য দপ্তরের বৈষম্য দূর করার দাবি

প্রচারপত্রে বিশেষভাবে ‘সচিবালয়ের ন্যায় পদ-পদবি’ এবং ‘এক ও অভিন্ন নিয়োগবিধি’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে একই ধরনের কাজ করা কর্মচারীদের পদ, গ্রেড, দায়িত্ব ও ক্যারিয়ার কাঠামোয় বিদ্যমান পার্থক্য দূর করার দাবি জানানো হচ্ছে।

এর আগের দাবিপত্রগুলোতেও সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের পদ-পদবি পরিবর্তন এবং অভিন্ন নিয়োগবিধির দাবি করা হয়েছিল।

এবারের সমাবেশের তাৎপর্য

এবারের কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের সময়টি নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যখন নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই প্রতিনিধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতির কথা বলা হলেও মূল বেতন, ভাতা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়সহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

ফলে ২১ আগস্টের প্রতিনিধি সমাবেশকে শুধু একটি নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি সরকারি কর্মচারীদের পক্ষ থেকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারের প্রতি দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়নের চাপ তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

গেজেট প্রকাশ হলেই কি সব দাবি পূরণ হবে?

এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৯ম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হলে মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার কাঠামো নির্ধারিত হতে পারে; কিন্তু টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, পদ-পদবি পরিবর্তন, অভিন্ন নিয়োগবিধি, পদোন্নতি, ভাতা পুনর্নির্ধারণ বা আউটসোর্সিং কর্মীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পৃথক প্রশাসনিক ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশকে কর্মচারীদের ৯ দফা দাবির একটি বড় অংশ বাস্তবায়নের সূচনা হিসেবে দেখা গেলেও এটিই সব দাবির চূড়ান্ত সমাধান নয়।

সামনে কী হতে পারে

সরকার যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। তবে গেজেটের চূড়ান্ত বেতনহার, গ্রেড কাঠামো, ভাতা, কার্যকর তারিখ এবং বকেয়া পাওনার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, কর্মচারীদের সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে গেজেট দ্রুত প্রকাশের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বৈষম্য দূর করার দাবিও সামনে এনেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে আন্দোলনের মূল ফোকাস শুধু ‘পে-স্কেল হবে কি না’—এখানে সীমাবদ্ধ না থেকে কী ধরনের পে-স্কেল হবে, কারা কতটা সুবিধা পাবেন এবং অন্যান্য বৈষম্য কীভাবে দূর হবে—এসব প্রশ্নে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, শুক্রবারের প্রতিনিধি সমাবেশটি নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারি কর্মচারীদের চলমান তৎপরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। বিশেষ করে গেজেট প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নিয়ে যখন নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন এই সমাবেশ থেকে সংগঠনটি সরকারের কাছে কতটা জোরালো বার্তা দিতে পারে—সেদিকেই এখন নজর সরকারি চাকরিজীবীদের।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *