অডিট সম্পন্ন না হলেও অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর পেনশন আটকে রাখা যাবে না
অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর কর্মস্থলের কোনো মেয়াদের হিসাব নিরীক্ষা বা অডিট সম্পন্ন না হওয়ার কারণে পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্ব করা যাবে না। এ ধরনের বিলম্বের কোনো বিধিগত ভিত্তি নেই বলে স্পষ্ট করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগের প্রবিধি-১ অধিশাখা ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি একটি পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর কর্মস্থলের কোনো সময়ের হিসাব অনিরীক্ষিত থাকার অজুহাতে পেনশন মঞ্জুরি আটকে রাখা বা বিলম্ব না করার জন্য সংশ্লিষ্ট পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারি নথিতে পরিপত্রটির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে—‘অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর কর্মস্থলের কোন মেয়াদের হিসাব নিরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়ায় পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্বকরণ।’
কেন এই পরিপত্র জারি করা হয়েছিল
পরিপত্রের পটভূমিতে বলা হয়, বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) কার্যালয় থেকে ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অর্থ বিভাগকে একটি পত্র পাঠানো হয়েছিল। ওই পত্রে অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর কর্মকালীন কোনো সময়ের হিসাব অনিরীক্ষিত থাকার কারণে যেন তার পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্ব না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।
অর্থ বিভাগের পরিপত্রে বলা হয়, কিছু কিছু পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ অধীনস্থ কর্মচারীর কর্মকালীন হিসাব নিরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়ার কারণে পেনশন মঞ্জুরি দিতে অহেতুক বিলম্ব করে থাকে। এ ধরনের প্রবণতাকে কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিট না হলে কি পেনশন আটকে রাখা যাবে?
পরিপত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কর্মচারীর চাকরিকালীন কোনো মেয়াদের হিসাব অডিট না হওয়া নিজে থেকে পেনশন আটকে রাখার কারণ হতে পারে না।
অর্থ বিভাগ বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR), Part-1-এর সংশ্লিষ্ট বিধান এবং বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের পেনশন মঞ্জুরি ও পরিশোধসংক্রান্ত ২০০৯ সালের সহজীকরণ আদেশ পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, কোনো মেয়াদের হিসাব অনিরীক্ষিত থাকার কারণে পেনশন মঞ্জুরি না করা কিংবা পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্ব বা অপেক্ষা করার কোনো বিধিগত ভিত্তি নেই।
অর্থাৎ, একজন কর্মচারী চাকরি শেষে অবসরে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছেন—এ অবস্থায় তার কর্মস্থলের কোনো সময়ের হিসাব এখনো অডিট হয়নি বলে পুরো পেনশন প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখা যাবে না।
অডিটের সঙ্গে পেনশনের বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অডিট আপত্তি থাকলে সেটি নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শুধু কোনো কর্মস্থলের কোনো মেয়াদের হিসাব অডিট হয়নি—এমন সাধারণ কারণে পেনশন আটকে রাখা যাবে না।
সরকারি পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০-তেও একই নীতিকে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অবসরগামী কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি থাকলে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় সভার মাধ্যমে আপত্তি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
ব্যক্তিগত দায় থাকলে কী হবে?
অডিট আপত্তি থাকলেই যে পেনশন বন্ধ থাকবে, এমন নয়। বরং অডিট আপত্তিতে অবসরগামী কর্মচারীর ব্যক্তিগত আর্থিক দায় রয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণ করতে হবে।
২০২০ সালের পেনশন সহজীকরণ আদেশ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত দায় না থাকলে নিয়ম অনুযায়ী পেনশন মঞ্জুর করতে হবে। আর ব্যক্তিগত দায় থাকলে সংশ্লিষ্ট অর্থ পেনশনারের কাছ থেকে আদায় অথবা প্রাপ্য আনুতোষিক থেকে কর্তনের মাধ্যমে পেনশন কেস নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলতে পারে; কিন্তু তার অজুহাতে একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর বৈধ পেনশন সুবিধা অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখা যাবে না।
কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা না হলে পেনশন আটকে রাখা যাবে না
পেনশন সহজীকরণ আদেশে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো অডিট আপত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তিকে দায়ী না করলে অথবা ওই আপত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কোনো আর্থিক সংশ্লেষ না থাকলে, সেই অডিট আপত্তির কারণে পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্ব করা যাবে না।
এ বিধানটির মূল উদ্দেশ্য হলো—অন্য কোনো কর্মকর্তা, দপ্তর বা পূর্ববর্তী সময়ের হিসাবের অনিষ্পন্নতার দায় যেন অবসরগামী কর্মচারীর পেনশন প্রাপ্যতার ওপর অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
একাধিক কর্মস্থলের অডিট বাকি থাকলেও পেনশন বন্ধ নয়
একজন সরকারি কর্মচারী দীর্ঘ চাকরিজীবনে একাধিক দপ্তর বা কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলের হিসাব অডিট সম্পন্ন নাও হতে পারে।
এ ক্ষেত্রেও নীতিটি একই। সরকারি পেনশন ব্যবস্থার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অবসরগামী কর্মচারীর এক বা একাধিক কর্মস্থলের কোনো সময়ের অডিট অসম্পন্ন থাকার কারণে তার পেনশন মঞ্জুরিতে বিলম্ব করা যাবে না। ২০২০ সালের পেনশন সহজীকরণ আদেশেও এই বিষয়টি সরাসরি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারির অর্থ বিভাগের পরিপত্র অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের জন্য এর গুরুত্ব
সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর একজন কর্মচারীর প্রধান আর্থিক নিরাপত্তার উৎসগুলোর একটি হলো পেনশন ও আনুতোষিক। তাই অডিটের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ার কারণে পেনশন আটকে গেলে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও তার পরিবারের ওপর সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই অর্থ বিভাগের নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে—অডিট ও পেনশন—দুটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আলাদা রেখে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। অডিটের কাজ চলবে, অডিট আপত্তি থাকলে তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে; কিন্তু শুধু অডিট অসম্পন্ন থাকার কারণে পেনশন মঞ্জুরি থামিয়ে রাখা হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করণীয়
অর্থ বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী, পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষকে অবসরগামী কর্মচারীর পেনশন কেস অযথা আটকে না রেখে বিধি অনুযায়ী দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে কোনো বাস্তব অডিট আপত্তি বা আর্থিক দায় থাকলে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ ও নিষ্পত্তি করতে হবে। অর্থাৎ, অডিটের দায় নির্ধারণ ও আদায়যোগ্য অর্থের বিষয়টি আলাদাভাবে নিষ্পত্তি হবে; আর বৈধ পেনশন প্রাপ্যতা অযথা বিলম্বিত হবে না।
২১ দিনের অনাপত্তি ব্যবস্থার সঙ্গেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি পেনশন ব্যবস্থার সামগ্রিক সহজীকরণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনাপত্তি বা দায়-দেনা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মতামত না দিলে পরবর্তী ধাপে পেনশন কেস পাঠানোর বিধান রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, অবসরজনিত সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কোনো কাজ অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ রাখা হয়নি।
মূল কথা এক নজরে
১. কর্মস্থলের কোনো মেয়াদের হিসাব অডিট না হওয়া পেনশন আটকে রাখার কারণ নয়।
২. অডিট অসম্পন্ন থাকলেও পেনশন মঞ্জুরি প্রক্রিয়া চলবে।
৩. অডিট আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ব্যক্তিগত দায় আছে কি না তা নির্ধারণ করতে হবে।
৪. ব্যক্তিগত দায় না থাকলে নিয়মিতভাবে পেনশন মঞ্জুর করতে হবে।
৫. ব্যক্তিগত আর্থিক দায় থাকলে বিধি অনুযায়ী অর্থ আদায় বা আনুতোষিক থেকে কর্তনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৬. একাধিক কর্মস্থলের কোনো সময়ের অডিট অসম্পন্ন থাকলেও শুধু সে কারণে পেনশন আটকে রাখা যাবে না।
৭. ২০১৯ সালের অর্থ বিভাগের পরিপত্রে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ২০২০ সালের পেনশন সহজীকরণ আদেশেও বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সারসংক্ষেপ
অবসরগামী সরকারি কর্মচারীর পেনশন কোনো দপ্তরের অডিট কার্যক্রমের ওপর অনির্দিষ্টকাল নির্ভরশীল নয়। অর্থ বিভাগের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মজীবনের কোনো সময়ের হিসাব অডিট সম্পন্ন না হলেও শুধু সেই কারণ দেখিয়ে পেনশন মঞ্জুরি বন্ধ বা বিলম্ব করা যাবে না। আর যদি নির্দিষ্ট অডিট আপত্তি থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফলে কোনো অবসরগামী সরকারি কর্মচারীকে যদি শুধু “আপনার আগের কর্মস্থলের অডিট এখনো হয়নি”—এই কারণ দেখিয়ে পেনশন মঞ্জুরি থেকে দীর্ঘ সময় বঞ্চিত করা হয়, তাহলে বিষয়টি প্রচলিত সরকারি পেনশন বিধান ও অর্থ বিভাগের ৬ জানুয়ারি ২০১৯ সালের পরিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।


