পূর্ণাঙ্গ নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ১৫% প্রণোদনা বহাল রাখার দাবি
দীর্ঘ ১১ বছর পর নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান বিশেষ প্রণোদনা। পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে কোনোভাবেই ১৫ শতাংশ প্রণোদনা সমন্বয় বা বাতিল না করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।
দীর্ঘ সময় ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। তবে সংগঠনটির মতে, পে-স্কেল একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর না হলে শুধু নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দিয়ে কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমবে না। বরং ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা তুলে নেওয়া হলে অনেক কর্মচারীর প্রকৃত আয় প্রত্যাশার তুলনায় কমে যেতে পারে।
সেই কারণে নবম পে-স্কেলের সব ধাপ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ১৫ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখার দাবি সামনে এনেছে কল্যাণ সমিতি।
১১ বছর পর পে-স্কেল, কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, দীর্ঘ ১১ বছর পর ৩১ আগস্ট নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, এই সময়ে প্রায় ২৩ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অবসরভোগী নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
তবে নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পরও কর্মচারীদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—পে-স্কেলের পূর্ণ সুবিধা হাতে আসার আগেই যদি বর্তমান বিশেষ প্রণোদনা প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে মাসিক আয় কতটা বাড়বে?
কল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক বক্তব্যের মূল উদ্বেগ এখানেই।
চট্টগ্রামে ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির চট্টগ্রাম জেলা শাখার কাউন্সিল ও নবম পে-স্কেলসংক্রান্ত আলোচনা সভায় বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন, কয়েক ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কারণে প্রথম দিকে বেতন বৃদ্ধির সুফল সীমিত থাকতে পারে। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ প্রণোদনা সমন্বয় করা হলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
কেন ১৫ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখার দাবি?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধার বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১০ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা পাচ্ছেন। এর আগে বিদ্যমান হার ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপনে এ সুবিধা বাড়ানো হয় এবং এতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছিল।
অর্থাৎ, ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বর্তমানে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের মাসিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার প্রথম ধাপেই যদি এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও হাতে পাওয়া অর্থের বৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।
কল্যাণ সমিতির যুক্তি হলো, নতুন পে-স্কেলের পূর্ণ কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরোনো আর্থিক সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে কর্মচারীরা একই সময়ে দুটি পরিবর্তনের চাপের মুখে পড়বেন—একদিকে ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয়, অন্যদিকে বিদ্যমান প্রণোদনা কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
পে-স্কেল বাস্তবায়ন ও প্রণোদনা—দুটি বিষয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নবম পে-স্কেল নিয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতে মূল বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে এবং এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর ফলে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ আর্থিক সুবিধা পেতে কর্মচারীদের অপেক্ষা করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিদ্যমান ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা সরাসরি বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ধরা যাক, কোনো কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। ১৫ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে তিনি ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত পান। যদি পে-স্কেলের পূর্ণ সুবিধা পাওয়ার আগেই এই ৩ হাজার টাকা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে নতুন বেতন কাঠামোর প্রথম ধাপে পাওয়া বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যত প্রণোদনা হারানোর কারণে কমে যেতে পারে।
তবে এটি একটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব; প্রত্যেক কর্মচারীর প্রকৃত বেতন, গ্রেড, ফিক্সেশন এবং নতুন পে-স্কেলের ধাপ অনুযায়ী ফলাফল ভিন্ন হবে।
‘বেতন বাড়লেও প্রকৃত আয় যেন কমে না যায়’
কল্যাণ সমিতির দাবির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি বনাম প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা।
দীর্ঘ ১১ বছর নতুন পে-স্কেল না হওয়ায় এ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান বেতন কাঠামোর সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় অনেক কর্মচারী ঋণগ্রস্ত হয়েছেন এবং আর্থিক চাপে পড়েছেন। ১ সেপ্টেম্বরের এক বিবৃতিতেও সংগঠনটি দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে বেতন-ভাতা সমন্বয়ের আহ্বান জানিয়েছে।
এ কারণে নতুন পে-স্কেলকে শুধু ‘কত শতাংশ বেতন বাড়ল’—এই হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। বরং কর্মচারীর হাতে বাস্তবে কত টাকা বাড়ছে এবং সেই টাকা দিয়ে বর্তমান বাজারে আগের তুলনায় কতটা বেশি পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সর্বনিম্ন বেতন নিয়েও ছিল সংগঠনের আপত্তি
নবম পে-স্কেলের সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে এর আগেও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি আপত্তি জানিয়েছিল। আগস্টে সংগঠনটি বলেছিল, দীর্ঘ ১১ বছরের ব্যবধান এবং দ্রব্যমূল্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এর আগে দুটি পে-স্কেল সমন্বয় করে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবির কথাও জানানো হয়েছিল।
সুতরাং, বর্তমান ১৫ শতাংশ প্রণোদনা বহাল রাখার দাবি মূলত তাদের বৃহত্তর অবস্থানেরই অংশ—নতুন পে-স্কেলের সুবিধা যেন বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ কী?
সরকারের সামনে এখন মূলত দুটি বিষয় সমন্বয়ের প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, নবম পে-স্কেলের বাস্তবায়ন দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা।
দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার আগের অন্তর্বর্তী সময়ে কর্মচারীদের বর্তমান আয় যাতে হঠাৎ কমে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা।
পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ সুবিধা বাতিল করার আলোচনা ইতোমধ্যে সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ১৫ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু কল্যাণ সমিতির দাবি হলো, পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তত বর্তমান ১৫ শতাংশ সুবিধা বহাল রাখা হোক।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা—প্রজ্ঞাপন দ্রুত, বাস্তবায়ন পূর্ণাঙ্গ
কল্যাণ সমিতি নবম পে-স্কেলের অনুমোদনকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্যে দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে বেতন-ভাতা সমন্বয় এবং যুগোপযোগী ভাতা সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, কর্মচারীদের বর্তমান দাবি শুধু বেতন বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের প্রত্যাশা হচ্ছে—
- নবম পে-স্কেল দ্রুত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করা;
- পে-স্কেলের সব ধাপ নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা;
- পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগে ১৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা প্রত্যাহার বা সমন্বয় না করা;
- দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা পুনর্বিবেচনা করা;
- বিভিন্ন ভাতা যুগোপযোগী করা;
- নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া।
‘প্রণোদনা বহাল’ দাবির অর্থ কী?
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কল্যাণ সমিতির এই দাবি মূলত একটি রূপান্তরকালীন সুরক্ষা ব্যবস্থা চাচ্ছে।
অর্থাৎ, সরকার যখন পুরোনো বেতন কাঠামো থেকে নতুন কাঠামোয় পুরোপুরি স্থানান্তর করবে, সেই সময় পর্যন্ত কর্মচারীদের বর্তমান আয় যাতে আকস্মিকভাবে কমে না যায়, সে জন্য ১৫ শতাংশ প্রণোদনা চালু রাখার দাবি করা হচ্ছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় অব্যাহত থাকবে—এটি অবশ্যই সরকারের জন্য একটি বড় বিবেচনার বিষয়। কারণ ২০২৫ সালে বিশেষ সুবিধা বৃদ্ধির সময়ই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে কর্মচারী সংগঠনগুলোর দৃষ্টিতে, এই ব্যয়কে শুধু অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় হিসেবে না দেখে পে-স্কেল বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয় হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
শেষ কথা
দীর্ঘ ১১ বছর পর নবম জাতীয় পে-স্কেলের অনুমোদন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কিন্তু অনুমোদন এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হলে প্রথম পর্যায়ে কর্মচারীরা প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধার পুরোটা নাও পেতে পারেন।
এই বাস্তবতায় পূর্ণাঙ্গ নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ১৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা বহাল রাখার দাবি এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে পরিণত হয়েছে। ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে কল্যাণ সমিতির আলোচনা সভায়ও এ দাবিই জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
এখন দেখার বিষয়, সরকার কর্মচারীদের এই দাবিকে কীভাবে বিবেচনা করে এবং নবম পে-স্কেলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগের সময়ে বিদ্যমান আর্থিক সুবিধা অব্যাহত রেখে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেয় কি না।



