৯ম পে স্কেলে ১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন হলে কত হবে? ৫০%-২৫%-২৫% ফিক্সেশনের হিসাব ও বাস্তবতা
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুমোদনের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে নতুন স্কেলে পুরোনো কর্মচারীদের বেতন ফিক্সেশন। বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে বর্তমানে যাদের মূল বেতন ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে, তারা নতুন স্কেলে ঠিক কত টাকা মূল বেতন পাবেন—এ নিয়ে নানা হিসাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
সরকার ৩১ আগস্ট নবম জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে। এতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত বেতন ফিক্সেশনের বিস্তারিত সূত্র অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনায় নির্ধারিত হবে।
এই কারণে ১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন পাওয়া একজন কর্মচারীর নতুন বেতন কত হবে—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে “ফিক্সেশন পদ্ধতি” এবং “ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন”—এই দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
১১,৬৫০ টাকা থেকে ২৩,৪০০ টাকা—হিসাবটি কোথা থেকে এলো?
অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল–২০১৫ অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা।
ধরা যাক, কোনো কর্মচারী বর্তমানে ওই গ্রেডে ১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন পাচ্ছেন।
তাহলে গ্রেডের শুরু থেকে তার অতিরিক্ত বেতন—
১১,৬৫০ − ৮,২৫০ = ৩,৪০০ টাকা।
অর্থাৎ তিনি পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের তুলনায় ৩,৪০০ টাকা এগিয়ে আছেন।
এখন একটি পার্থক্য সংরক্ষণ পদ্ধতি ধরে যদি নতুন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২০,০০০ টাকার সঙ্গে এই ৩,৪০০ টাকা যোগ করা হয়, তাহলে—
২০,০০০ + ৩,৪০০ = ২৩,৪০০ টাকা।
অর্থাৎ এই বিশেষ হিসাব-পদ্ধতিতে সম্ভাব্য নতুন মূল বেতন হবে—
২৩,৪০০ টাকা।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো, সরকারের চূড়ান্ত ব্যক্তিগত ফিক্সেশন বিধি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ২৩,৪০০ টাকাকে নিশ্চিত সরকারি বেতন বলা যাবে না। সরকার নিজেই জানিয়েছে, অর্থ বিভাগ বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা জারি করবে।
এবার ৫০%-২৫%-২৫% ধাপে হিসাব করলে কী দাঁড়ায়?
১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে নতুন বেতনের বর্ধিত অংশ তিন ধাপে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে—প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে আরও ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে:
৫০%-২৫%-২৫% পুরো মূল বেতনের ওপর নয়; নতুন ও পুরোনো বেতনের যে অতিরিক্ত অংশ, সেটির ওপর প্রয়োগ করতে হবে।
যদি ১১,৬৫০ টাকা থেকে সম্ভাব্য চূড়ান্ত ফিক্সেশন ২৩,৪০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে মোট বৃদ্ধি—
২৩,৪০০ − ১১,৬৫০ = ১১,৭৫০ টাকা।
এই ১১,৭৫০ টাকাই হলো অতিরিক্ত বা বর্ধিত অংশ।
প্রথম ধাপ: ৫০%
১১,৭৫০ × ৫০% = ৫,৮৭৫ টাকা
তাই প্রথম ধাপে মূল বেতন—
১১,৬৫০ + ৫,৮৭৫
= ১৭,৫২৫ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: আরও ২৫%
১১,৭৫০ × ২৫% = ২,৯৩৭.৫০ টাকা
তাই দ্বিতীয় ধাপে—
১৭,৫২৫ + ২,৯৩৭.৫০
= ২০,৪৬২.৫০ টাকা
তৃতীয় ধাপ: অবশিষ্ট ২৫%
আরও ২,৯৩৭.৫০ টাকা যোগ হলে—
২০,৪৬২.৫০ + ২,৯৩৭.৫০
= ২৩,৪০০ টাকা।
এক নজরে সম্ভাব্য হিসাব
| পর্যায় | হিসাব | সম্ভাব্য মূল বেতন |
|---|---|---|
| বর্তমান | — | ১১,৬৫০ |
| ১ম ধাপ | ৫০% বৃদ্ধি | ১৭,৫২৫ |
| ২য় ধাপ | আরও ২৫% | ২০,৪৬২.৫০ |
| ৩য় ধাপ | অবশিষ্ট ২৫% | ২৩,৪০০ |
অর্থাৎ পার্থক্য পদ্ধতিতে ২৩,৪০০ টাকা চূড়ান্ত বেতন ধরা হলে, ৫০%-২৫%-২৫% বাস্তবায়নে সম্ভাব্য মূল বেতন হবে:
১১,৬৫০ → ১৭,৫২৫ → ২০,৪৬২.৫০ → ২৩,৪০০ টাকা।
কিন্তু ২০তম গ্রেডের নতুন কর্মচারীর ক্ষেত্রে হিসাবটি আলাদা
এখানেই অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
নতুন স্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২০,০০০ টাকা। পুরোনো স্কেলে সেটি ছিল ৮,২৫০ টাকা।
অর্থাৎ নতুন বর্ধিত অংশ—
২০,০০০ − ৮,২৫০ = ১১,৭৫০ টাকা।
এই ১১,৭৫০ টাকার ৫০ শতাংশ হলো—
৫,৮৭৫ টাকা।
তাই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে—
৮,২৫০ + ৫,৮৭৫ = ১৪,১২৫ টাকা।
পরবর্তী ২৫ শতাংশে আরও ২,৯৩৭.৫০ টাকা যোগ হয়ে হবে—
১৭,০৬২.৫০ টাকা।
শেষ ২৫ শতাংশ যোগ হলে হবে—
২০,০০০ টাকা।
এই উদাহরণটিও প্রকাশিত প্রতিবেদনে একইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী এবং পুরোনো কর্মচারীর ফিক্সেশন এক বিষয় নয়।
তাহলে ১১,৬৫০ টাকা বেতন পাওয়া পুরোনো কর্মচারী কি ২৩,৪০০ টাকা পাবেন?
এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে “হ্যাঁ” বলা যাবে না।
কারণ ২৩,৪০০ টাকার হিসাবটি করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট পার্থক্য-সংরক্ষণ সূত্র ধরে।
বাস্তবে পুরোনো কর্মচারীদের ফিক্সেশনে সরকার কী করবে, সেটি নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফিক্সেশন বিধির ওপর। যেমন—
- বর্তমান মূল বেতন;
- সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন;
- অর্জিত ইনক্রিমেন্ট;
- পদোন্নতি;
- উচ্চতর গ্রেড;
- টাইম স্কেল/অন্যান্য সুবিধা;
- বেতন সংরক্ষণের বিধান;
- নতুন স্কেলের ধাপ;
- নতুন স্কেলে ইনক্রিমেন্টের নিয়ম
ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে।
সরকারের অনুমোদিত সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে এবং সেখানেই বেতন নির্ধারণ পদ্ধতির বিস্তারিত বিধান থাকবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন: ৫০%-২৫%-২৫% বনাম ৩০%-৩৫%-৩৫%
নবম পে স্কেল নিয়ে বর্তমানে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বাস্তবায়নের ধাপ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে।
৩১ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ব্রিফিংয়ে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের মূল বেতন ৩০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ৩৫ শতাংশ পরের ধাপে এবং অবশিষ্ট ৩৫ শতাংশ পরবর্তী ধাপে কার্যকর করার প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছিল।
অন্যদিকে, পরবর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিশেষ করে ১০ম–২০তম গ্রেডে ৫০%-২৫%-২৫% এবং ১ম–৯ম গ্রেডে ৪০%-৩০%-৩০% বাস্তবায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
অতএব, চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের ভাষা না দেখে কোনো একটি ধাপকে শতভাগ নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ৫০%-২৫%-২৫% পদ্ধতি এবং ৩০%-৩৫%-৩৫% পদ্ধতিতে একই কর্মচারীর বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্য মূল বেতন আলাদা হবে।
২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
নতুন স্কেলে ২০তম গ্রেডের বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা হওয়ায় প্রারম্ভিক বেতনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হচ্ছে ১১,৭৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১৪২ শতাংশ। সরকারও জানিয়েছে, সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বর্তমানে ১১,৬৫০ টাকা পাওয়া প্রত্যেক কর্মচারীর বেতন সরাসরি ২৩,৪০০ টাকা হয়ে যাবে।
কারণ ১৪২ শতাংশ হলো গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের পরিবর্তনের হিসাব, ব্যক্তিগত কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতনের ওপর সরাসরি ১৪২ শতাংশ প্রয়োগের নিয়ম নয়।
ভাতার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন
নতুন পে স্কেলের প্রভাব শুধু মূল বেতনে সীমাবদ্ধ নয়। সরকার জানিয়েছে, নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও পুনর্নির্ধারণ করা হবে। এমনকি সব গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতা সম্প্রসারণ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩,০০০ টাকা ভাতার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন হারে বিভিন্ন ভাতা কখন থেকে কার্যকর হবে, সেটিও চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে পরিষ্কার হবে।
চূড়ান্ত কথা
১১,৬৫০ টাকা মূল বেতন পাওয়া ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর জন্য পার্থক্য পদ্ধতির সম্ভাব্য হিসাব করলে চিত্রটি দাঁড়ায়—
পুরোনো স্কেলের শুরু: ৮,২৫০ টাকা
বর্তমান মূল বেতন: ১১,৬৫০ টাকা
অর্জিত পার্থক্য: ৩,৪০০ টাকা
নতুন স্কেলের শুরু: ২০,০০০ টাকা
সম্ভাব্য ফিক্সেশন: ২০,০০০ + ৩,৪০০ = ২৩,৪০০ টাকা
আর এই ২৩,৪০০ টাকা যদি চূড়ান্ত ফিক্সেশন হিসেবে ধরা হয় এবং ৫০%-২৫%-২৫% বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রযোজ্য হয়, তাহলে সম্ভাব্য ধাপগুলো হবে—
প্রথম ধাপ: ১৭,৫২৫ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ২০,৪৬২.৫০ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ২৩,৪০০ টাকা
তবে ২৩,৪০০ টাকা এখনো নিশ্চিত সরকারি ফিক্সেশন নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবে অর্থ বিভাগের চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণ/ফিক্সেশন প্রজ্ঞাপন। কারণ সরকার নিজেই জানিয়েছে, বেতন ফিক্সেশনের বিস্তারিত নিয়ম পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত হবে।
সুতরাং, ১১,৬৫০ টাকা থেকে ২৩,৪০০ টাকা—এটি একটি সম্ভাব্য পার্থক্যভিত্তিক মডেল; চূড়ান্ত সরকারি হিসাব নয়। প্রজ্ঞাপনে যদি এই পার্থক্য সংরক্ষণ নীতি অনুমোদিত হয়, তখনই ২৩,৪০০ টাকার হিসাবটি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।



