৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেলে বেতন বাড়লেও ভাতা নিয়ে অসন্তোষ: ‘বৈষম্য কমেনি, বরং প্রশ্ন আরও বড় হয়েছে’

নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি নতুন করে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। মূল বেতন বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বিভিন্ন ভাতা—বিশেষ করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য সুবিধা—কতটা বাড়ছে, তা নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মূল বেতনের পার্থক্য মেনে নেওয়া গেলেও ভাতার কাঠামোতে প্রত্যাশিত সামঞ্জস্য না থাকলে বাস্তব আয় ও জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য থেকেই যাবে।

মন্ত্রিসভা ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে। এতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে।

‘বেতন বাড়ল, কিন্তু হাতে কত থাকবে?’

কর্মচারীদের ক্ষোভের মূল জায়গাটি এখানেই। কাগজে বেতন বৃদ্ধির হার বড় মনে হলেও একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত জীবনযাত্রার সক্ষমতা নির্ভর করে শুধু মূল বেতনের ওপর নয়; বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন, শিক্ষা, বিদ্যুৎ-গ্যাস, মোবাইল ও অন্যান্য ভাতার ওপরও নির্ভর করে।

অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন একবারে পুরোটা কার্যকর হচ্ছে না। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে এবং বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। ফলে কর্মচারীদের একটি অংশের প্রশ্ন—আজ বাজারে যে খরচ, সেই খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা পেতে যদি আরও সময় লাগে, তাহলে বর্তমান মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাবেন কীভাবে?

নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষোভ কেন বেশি?

২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হচ্ছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি রয়েছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে তার ব্যয়ের বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াতের মতো খাতে চলে যায়।

অন্যদিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাড়তি মূল বেতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক সুবিধার আর্থিক মূল্যও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। ফলে কর্মচারীদের প্রশ্ন হচ্ছে—শুধু মূল বেতনের অনুপাত কমালেই কি প্রকৃত আয়-বৈষম্য কমে?

সরকার অবশ্য জানিয়েছে, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। অর্থাৎ বেতন কাঠামোকে আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সমতাভিত্তিক করার চেষ্টা করা হয়েছে।

‘১-২ ইঞ্চি পার্থক্য মেনে নিলাম, ভাতায় কেন এত প্রশ্ন?’

কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে—উচ্চপদস্থ ও নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মূল বেতনে পার্থক্য থাকতেই পারে। দায়িত্ব, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পদমর্যাদার কারণে সেই পার্থক্যকে অনেকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন।

কিন্তু আপত্তি তৈরি হচ্ছে যখন ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধার কাঠামোও একইভাবে ওপরের দিকে বেশি সুবিধা তৈরি করে।

তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো—

“বেতনে পার্থক্য মেনে নিলাম, কিন্তু ভাতায়ও যদি বড় ব্যবধান থাকে, তাহলে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীর প্রকৃত জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসবে কীভাবে?”

এখানেই ‘The rich get richer, while the poor get poorer’—এই বহুল ব্যবহৃত কথাটি কর্মচারীদের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠছে।

অবশ্য সরকারি সিদ্ধান্তে কিছু সুবিধা সবার জন্য সম্প্রসারণের উদ্যোগও রয়েছে। যেমন, আগে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত মোবাইল ভাতা প্রযোজ্য থাকলেও নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বাড়িভাড়া ভাতাই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়

নতুন পে-স্কেল নিয়ে কর্মচারীদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জায়গাগুলোর একটি হলো বাড়িভাড়া। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় শহর ও জেলা পর্যায়ে বাসাভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

মূল বেতন বাড়লেও যদি বাড়িভাড়া ভাতা বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হারে না বাড়ে, তাহলে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের হাতে প্রকৃত অতিরিক্ত অর্থ খুব বেশি নাও থাকতে পারে।

বিশেষ করে ঢাকা ও বড় শহরে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মচারীর বেতন কয়েক হাজার টাকা বাড়লেও যদি বাসাভাড়া, বাজার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বৃদ্ধি বাস্তবে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে রূপ নাও নিতে পারে।

ধাপে ধাপে বেতন—কর্মচারীদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ

সরকার জানিয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় পুরো বেতনস্কেল একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে। মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হবে।

ফলে কর্মচারীদের দৃষ্টিতে সমস্যা হচ্ছে—নতুন বেতনস্কেল ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু ঘোষিত পুরো সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে হাতে আসছে না।

এদিকে বাজারে পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা ব্যয় ও চিকিৎসা ব্যয় কোনো ধাপে বাড়ে না; এগুলো প্রতিদিনের বাস্তবতা।

সুতরাং বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে ভাতা বাস্তবায়নের সময়ের ব্যবধান যত দীর্ঘ হবে, কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে তত বেশি পার্থক্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

২৪ লাখ কর্মচারী, ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত—প্রভাব বিশাল

সরকারি হিসাব অনুযায়ী নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এর জন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এটি শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বাজেট, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ব্যয়ের বড় একটি অংশ জড়িত।

সরকারের জন্য তাই একদিকে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি পূরণ, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ—দুই বিষয়ই সামলানো জরুরি।

তাহলে কর্মচারীদের দাবি আসলে কী?

বর্তমান আলোচনাকে বিশ্লেষণ করলে কর্মচারীদের দাবির মূল জায়গাগুলো দাঁড়ায়—

  • মূল বেতনের সঙ্গে ভাতার যৌক্তিক সমন্বয়;
  • বাড়িভাড়া ভাতা বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা;
  • চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ;
  • নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব;
  • বেতন ও ভাতা কার্যকরের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান কমানো;
  • মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করা।

‘সমস্যা শুধু বেতন নয়, প্রকৃত আয়’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বেতন স্কেলকে শুধু একটি সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা হলে সেটি নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি। কিন্তু একই সময়ে যদি বাড়িভাড়া ৫ হাজার টাকা, বাজার খরচ ৪ হাজার টাকা, যাতায়াত ২ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ২ হাজার টাকা বেড়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির বড় অংশই অতিরিক্ত ব্যয়ে চলে যেতে পারে।

অর্থাৎ প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—

“বেতন কত বাড়ল?” নয়; বরং “সব খরচ বাদ দেওয়ার পর কর্মচারীর হাতে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল?”

এই জায়গাটিই নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরীক্ষা।

শেষ কথা

নবম পে-স্কেল দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় একটি পরিবর্তন। সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ নিঃসন্দেহে আগের কাঠামোর তুলনায় বড় পরিবর্তন। পাশাপাশি সব গ্রেডকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য নতুন ভাতা চালুর মতো সিদ্ধান্তও ইতিবাচক।

তবে কর্মচারীদের বর্তমান অসন্তোষকে কেবল ‘বেতন বাড়েনি’ বলে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাদের বড় প্রশ্ন হলো—মূল বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে আনুষঙ্গিক ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কতটা ন্যায্যভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে?

কারণ একজন নিম্নগ্রেডের কর্মচারীর কাছে বেতন শুধু একটি সংখ্যা নয়; সেটিই তার পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি।

তাই নতুন পে-স্কেলের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে শুধু গেজেট প্রকাশ বা নতুন বেতন নির্ধারণে নয়—কর্মচারীদের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল, জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা সামলানো গেল এবং গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য বাস্তবে কতটা কমল—তার ওপর।

আর এখানেই কর্মচারীদের সেই প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে—

“বেতন বাড়ানো যদি হয়, তাহলে ভাতাগুলোও কি এমনভাবে বাড়ানো যায় না, যাতে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীও সত্যিকার অর্থে স্বস্তি অনুভব করেন?”

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *