৩০ জুনের আহরিত বেতন ধরে পে-ফিক্সেশন, ১ জুলাই ইনক্রিমেন্ট: ২০২৭ সালে শতভাগ নতুন বেসিক—কীভাবে হবে হিসাব?
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা এখন পে-ফিক্সেশন, ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই শতভাগ নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়া নিয়ে। বিশেষ করে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে মূল বেতন একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী আহরণ করেছেন, সেটিকে ভিত্তি করে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ এবং এরপর প্রাপ্য ইনক্রিমেন্ট যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে নবম গ্রেডে মূল বেতনের বর্ধিত অংশ তিন ধাপে এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ভিন্ন অনুপাতে কার্যকর করার বিধান রয়েছে।
৩০ জুনের বেতন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন পে-স্কেলে একজন কর্মরত চাকরিজীবীর বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তার পুরোনো স্কেলে আহরিত মূল বেতন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রকাশিত বিধানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৩০ জুনের বেতন থেকে নতুন স্কেলে সংশ্লিষ্ট বেতন নির্ধারণ করা হবে। কেউ যদি পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের ওপরে বেতন পেয়ে থাকেন, তাহলে পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন থেকে তার অতিরিক্ত অংশ বিবেচনায় নিয়ে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ করা হবে; প্রয়োজন হলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে সবার বেতন শুধু নতুন গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ধরে নির্ধারিত হবে—এমন নয়। চাকরিজীবীর ৩০ জুনের বাস্তব বেতন, পূর্ববর্তী ইনক্রিমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট গ্রেডের নতুন স্কেল—সবকিছু হিসাবের মধ্যে আসবে।
১ জুলাই ২০২৬-এর ইনক্রিমেন্ট নিয়ে কী হবে?
এখানেই চাকরিজীবীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।
নতুন আদেশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, প্রতি অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাইকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন স্কেলে বেতন পুনর্নির্ধারণের পর ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রযোজ্য বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির বিধানও রাখা হয়েছে।
ফলে ৩০ জুনের আহরিত বেতনকে ভিত্তি করে নতুন স্কেলে পে-ফিক্সেশন করার পর প্রাপ্য বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে নতুন বেতনের সঙ্গে সমন্বিত হবে, সেটিই বাস্তব হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘৩০ জুনের বেতন + ১ জুলাই ইনক্রিমেন্ট + পরদিনই সম্পূর্ণ নতুন বেসিক’—এমন সরল হিসাব পুরো কাঠামোকে প্রকাশ করে না। সরকারি আদেশ অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর বর্ধিত অংশ ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কতটা নতুন বেতন কার্যকর?
বর্তমান প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম থেকে নবম গ্রেডে নতুন ও পুরোনো বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
এরপর ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে মোট ৭০ শতাংশ এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে অবশিষ্ট অংশসহ পূর্ণ ১০০ শতাংশ কার্যকর হবে।
অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বর্ধিত অংশের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে, ২৫ শতাংশ দ্বিতীয় ধাপে এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ তৃতীয় ধাপে কার্যকর হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সহজভাবে সময়সূচি
| সময় | ১ম–৯ম গ্রেড | ১০ম–২০তম গ্রেড |
|---|---|---|
| ১ জুলাই ২০২৬ | বর্ধিত অংশের ৪০% | ৫০% |
| ১ জানুয়ারি ২০২৭ | মোট ৭০% | মোট ৭৫% |
| ১ জুলাই ২০২৭ | মোট ১০০% | মোট ১০০% |
এ কারণে ১ জুলাই ২০২৭ তারিখটি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ওই তারিখ থেকে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
একটি উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন নবম গ্রেডের কর্মকর্তা পুরোনো পে-স্কেলে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ৩০ হাজার টাকা মূল বেতন পাচ্ছেন।
নতুন স্কেলে নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে—অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
কিন্তু ওই কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ইনক্রিমেন্ট পেয়ে ৩০ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন। তাই তার ক্ষেত্রে সরাসরি ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকার উদাহরণ প্রয়োগ করা যাবে না। ৩০ জুনের আহরিত বেতন এবং নতুন স্কেলের নির্ধারণী নিয়ম অনুসারে তার পে-ফিক্সেশন করতে হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাইয়ের বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির বিষয়টি হিসাবের মধ্যে আসবে।
অর্থাৎ, প্রত্যেক চাকরিজীবীর চূড়ান্ত বেতন একই হবে না। একই গ্রেডে থেকেও চাকরির মেয়াদ, পূর্ববর্তী ইনক্রিমেন্ট ও ৩০ জুনের মূল বেতনের কারণে পে-ফিক্সেশনের ফল ভিন্ন হতে পারে।
১ জুলাই ২০২৭-এ কি শুধু নতুন বেসিকই বাড়বে?
১ জুলাই ২০২৭-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে নতুন বেতন কাঠামোর অবশিষ্ট অংশ কার্যকর হয়ে পূর্ণ নতুন মূল বেতন প্রতিষ্ঠিত হওয়া।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে নবম গ্রেডে ৪০ শতাংশ + ৩০ শতাংশ + ৩০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ + ২৫ শতাংশ + ২৫ শতাংশ কাঠামোতে বর্ধিত অংশ সম্পূর্ণ হবে।
তবে পূর্ণ নতুন ভাতা একই সময়ে কার্যকর হবে না। প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী নতুন হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতার বড় অংশ ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ—
১ জুলাই ২০২৬ → নতুন স্কেলের প্রথম ধাপ
১ জানুয়ারি ২০২৭ → দ্বিতীয় ধাপ
১ জুলাই ২০২৭ → পূর্ণ নতুন বেসিক
১ জানুয়ারি ২০২৮ → নতুন হারে অধিকাংশ ভাতা
ইনক্রিমেন্টের সঙ্গে ১০০ শতাংশ নতুন বেসিক যুক্ত হওয়ার বিষয়টি
চাকরিজীবীদের মধ্যে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তা হলো—২০২৭ সালের ১ জুলাই পূর্ণ নতুন বেসিক কার্যকর হওয়ার সময় বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে।
প্রকাশিত নতুন আদেশের ব্যাখ্যায় ১ জুলাইকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে নতুন স্কেলের পূর্ণ বেতন কার্যকর হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ক্ষেত্রে ঠিক কত টাকা ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে, তা জানতে তার গ্রেড, ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন, পে-ফিক্সেশনের ফল এবং প্রযোজ্য ইনক্রিমেন্টের ধাপ ধরে হিসাব করতে হবে।
তাই ‘সবার বেতন ১০০ শতাংশ বাড়বে’—এভাবে বলা সঠিক নয়। নতুন স্কেলের নির্ধারিত মূল বেতন বৃদ্ধির হার এবং ব্যক্তিগত পে-ফিক্সেশনের ফল এক বিষয় নয়।
IBAS++ পে-ফিক্সেশনও গুরুত্বপূর্ণ
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো IBAS++-এ অনলাইন পে-ফিক্সেশন। প্রকাশিত বিধান অনুযায়ী, নতুন স্কেলে কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের পর তা যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া থাকবে এবং চূড়ান্তভাবে যাচাইকৃত বেতন নির্ধারণী বিবরণের ভিত্তিতে বেতন পরিশোধ করা হবে।
এ কারণে শুধু কাগজে নতুন বেতন নির্ধারণ হলেই বিষয়টি শেষ হবে না। পে-ফিক্সেশন → DDO যাচাই → হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদন → IBAS++-এ বেতন কার্যকর → বেতন বিল প্রস্তুত—পুরো প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরিজীবীদের জন্য মূল বার্তা
সব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি দাঁড়ায়—
- ৩০ জুন ২০২৬-এর আহরিত মূল বেতন নতুন পে-ফিক্সেশনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
- ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নবম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছে।
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ১ জুলাইয়ের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হিসাবের মধ্যে আসবে।
- নতুন বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর নয়; ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে।
- ১ জানুয়ারি ২০২৭ দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হবে।
- ১ জুলাই ২০২৭ নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ ১০০ শতাংশ বর্ধিত অংশ কার্যকর হওয়ার কথা।
- নতুন হারে অধিকাংশ ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
- ব্যক্তিভেদে চূড়ান্ত বেতন নির্ভর করবে তার ৩০ জুনের বেতন, গ্রেড, পূর্ববর্তী ইনক্রিমেন্ট এবং পে-ফিক্সেশনের ফলের ওপর।
শেষ কথা
সকালের আলোচনায় যে কথাটি বলা হচ্ছে—“৩০ জুন ২০২৬-এর আহরিত বেতন অনুযায়ী পে-ফিক্সেশন, ১ জুলাই ইনক্রিমেন্ট এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণ নতুন বেসিক”—এর মধ্যে মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। তবে বিষয়টিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে ‘পুরো নতুন বেসিক ১০০ শতাংশ’ বলতে নতুন স্কেলের বর্ধিত অংশের পূর্ণ বাস্তবায়ন বোঝাতে হবে; এটি প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত বেতন ঠিক ১০০ শতাংশ বাড়বে—এমন অর্থ নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চূড়ান্ত পে-ফিক্সেশন ও IBAS++-এ বাস্তবায়িত হিসাবই একজন কর্মচারীর প্রকৃত নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করবে।


