সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব, ৫ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে টাকা তোলার সুযোগ

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় ও গ্রাহকবান্ধব করতে একাধিক নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো—অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় জমা অর্থ তুলে নিয়ে কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার সুযোগ। বর্তমানে এমন কোনো এক্সিট সুবিধা নেই।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আলোচ্যসূচিতে থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, পাঁচ বছর অর্থ জমা দেওয়ার পর কোনো গ্রাহক গুরুতর শারীরিক বা আর্থিক সমস্যায় পড়লে তাঁর আবেদন বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সঞ্চয়ে যুক্ত হওয়ার পর মাঝপথে অনিবার্য সংকটে পড়লে গ্রাহকের জন্য একটি প্রস্থানপথ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কেন এই পরিবর্তনের প্রয়োজন হচ্ছে

২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হওয়ার পর তিন বছর পার হলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন এবং তাঁদের মোট জমার পরিমাণ প্রায় ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা

গ্রাহকদের আগ্রহ কম থাকার কারণ হিসেবে ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন কম হওয়া এবং অবসর-পূর্ব সময়ে অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রচলিত নিয়মে একবার পেনশন স্কিমে যুক্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া মাঝপথে বের হয়ে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

ফলে নিয়মিত চাঁদা চালিয়ে যেতে না পারলে গ্রাহকের জন্য বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—এমন অভিযোগ ও দাবি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। নতুন প্রস্তাবের লক্ষ্য সেই অনিশ্চয়তা কিছুটা কমানো।

৫ বছর পর টাকা তোলার নিয়মটি কী হতে পারে

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পাঁচ বছর চাঁদা প্রদান একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে থাকছে। এরপর কেউ শারীরিক বা আর্থিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় তাঁর জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা তুলে নেওয়ার সাধারণ সুযোগ নয়; শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতি এবং কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়টি প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, ‘পাঁচ বছর পর যেকোনো সময় ইচ্ছা হলেই পুরো টাকা তুলে নেওয়া যাবে’—এমন সাধারণ নিয়ম এখনো কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এটি বর্তমানে পরিবর্তনের প্রস্তাব হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন-শর্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

বর্তমান নিয়মে কী আছে

সর্বজনীন পেনশনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পেনশনযোগ্য বয়সের আগে জমা অর্থ এককালীন নগদায়ন বা premature encashment করার সুযোগ নেই। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে জমাকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুনে বিধিমালায় পরিবর্তন এনে পেনশনযোগ্য বয়সে পৌঁছানোর পর একজন চাঁদাদাতাকে তাঁর মোট কর্পাসের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। এটি পাঁচ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের প্রস্তাবের সঙ্গে আলাদা বিষয়।

শুধু টাকা তোলার সুবিধাই নয়, আসছে আরও পরিবর্তন

সর্বজনীন পেনশনকে জনপ্রিয় করতে পাঁচ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি পরিবর্তনের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন চালুর প্রস্তাব।
  • পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব।
  • সর্বজনীন পেনশনে ইসলামি বা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ।
  • গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা।
  • পেনশন স্কিমে গ্রাহক নিবন্ধনকারী ব্যাংক, ডাক বিভাগ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ‘এক্সিট’ সুবিধা

সর্বজনীন পেনশন মূলত দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা। তাই দীর্ঘ সময় টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের অন্যতম উদ্বেগ হলো—জীবনের কোনো পর্যায়ে আয় কমে গেলে, কর্মক্ষমতা হারালে বা বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হলে কী হবে।

প্রস্তাবিত পাঁচ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ সেই উদ্বেগের একটি অংশ কমাতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে আর্থিক নিরাপত্তার একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো অবসরকালীন নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা। তাই মাঝপথে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ কতটা, কোন পরিস্থিতিতে দেওয়া হবে এবং কতটুকু অর্থ তোলা যাবে—এসব শর্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সব মিলিয়ে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর বিশেষ পরিস্থিতিতে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এটি এখনো প্রস্তাবিত পরিবর্তন—চূড়ান্ত বিধি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে কার্যকর নিয়ম হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

সরকারি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার বর্তমান তথ্যেও মেয়াদ পূর্তির আগে জমা অর্থ নগদায়নের সুযোগ না থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। ফলে নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত ও কার্যকর হলে সেটি বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে।

সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণ বাড়াতে তাই এখন মূল নজর থাকবে—পাঁচ বছর পর বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের প্রস্তাবটি কী শর্তে অনুমোদিত হয় এবং কবে থেকে তা কার্যকর করা হয়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *