আইবাস++ । পে ফিক্সেশন । ই-ফাইলিং

iBAS++ পে ফিক্সেশন ২০২৬: NID, Basic Pay থেকে সার্ভিস বুক—যা লাগবে সবই

নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনা। নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া অনলাইনে iBAS++ Pay Fixation ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-এ অনলাইন বেতন নির্ধারণের আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মচারী অনলাইনে তথ্য পূরণ করে আবেদন জমা দেবেন, এরপর সংশ্লিষ্ট Drawing and Disbursing Officer (DDO) তথ্য যাচাই করবেন এবং হিসাবরক্ষণ অফিস চূড়ান্ত যাচাই ও অনুমোদন করবে। ফলে অক্টোবরের পে ফিক্সেশনকে সামনে রেখে এখন থেকেই ব্যক্তিগত তথ্য, চাকরির রেকর্ড এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

iBAS++-এ পে ফিক্সেশন কীভাবে হবে

নতুন ব্যবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের iBAS++-এর নির্ধারিত Pay Fixation অপশনে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে। payfixation.gov.bd থেকে প্রবেশ করলেও ব্যবহারকারীকে iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

গেজেটেড কর্মকর্তারা iBAS++-এর User ID ও Password ব্যবহার করে লগইন করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীরা NID নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো OTP ব্যবহার করবেন। বিদেশে অবস্থানরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ই-মেইলে OTP পাঠানোর ব্যবস্থার কথাও নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে।

অক্টোবরের পে ফিক্সেশনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি

পে ফিক্সেশন শুরু হওয়ার পর তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সময়ক্ষেপণ বা ভুলের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাই আগে থেকেই নিচের বিষয়গুলো যাচাই করে রাখা প্রয়োজন।

১. জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID

প্রথমেই নিজের NID নম্বর, নাম ও জন্মতারিখ সঠিক আছে কি না যাচাই করতে হবে।

বিশেষ করে চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখ এবং NID-এর জন্মতারিখে পার্থক্য থাকলে পে ফিক্সেশনের আগে বিষয়টি সংশোধন করার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো কর্মচারীর NID না থাকলে আগে NID নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।

অর্থাৎ, পে ফিক্সেশনের সময় সমস্যা এড়াতে NID-এর তথ্য এবং সার্ভিস রেকর্ডের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর

iBAS++-এ যে মোবাইল নম্বর নিবন্ধিত রয়েছে, সেটি সচল রাখতে হবে। কারণ নন-গেজেটেড কর্মচারীদের লগইনের ক্ষেত্রে OTP ওই নিবন্ধিত নম্বরে পাঠানো হবে। আবেদন জমা দেওয়ার পরও নিবন্ধিত মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় SMS পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তাই মোবাইল নম্বর পরিবর্তিত হয়ে থাকলে পে ফিক্সেশনের আগে রেকর্ডে সেটি সঠিকভাবে আছে কি না যাচাই করা উচিত।

৩. চাকরির যাবতীয় তথ্য

পে ফিক্সেশনের সময় শুধু ব্যক্তিগত তথ্য দিলেই হবে না; চাকরি ও বেতনের পূর্ববর্তী তথ্যও প্রয়োজন হবে।

প্রস্তুত রাখুন—

  • পদবী
  • বর্তমান গ্রেড
  • নিয়োগের তারিখ
  • চাকরিতে যোগদানের তারিখ
  • বর্তমান কর্মস্থল
  • পূর্ববর্তী পদ ও কর্মস্থলের তথ্য
  • বর্তমান মূল বেতন
  • পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য
  • পদোন্নতির তথ্য
  • উচ্চতর গ্রেডের তথ্য
  • প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের তথ্য।

বিশেষ করে নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বই অনুযায়ী পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনের তথ্য যাচাই করা হবে।

৪. বেতন নির্ধারণসংক্রান্ত অফিস আদেশ

পে ফিক্সেশনের আগে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশগুলোর সফট কপি প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনে যেসব নথি লাগতে পারে—

নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র, বদলির আদেশ, পদোন্নতির আদেশ, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন পুনঃনির্ধারণসংক্রান্ত আদেশ।

নির্দেশনায় এসব কাগজপত্র PDF বা JPEG ফরম্যাটে প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে।

৫. নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র

যারা নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এবং যাদের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের ইতিহাস নেই, তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু অতিরিক্ত নথি প্রস্তুত রাখতে হবে।

এর মধ্যে থাকতে পারে—

  • শিক্ষাগত সনদ
  • নিয়োগপত্র
  • যোগদানপত্র
  • স্বাস্থ্যগত সনদ
  • অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র।

এসব নথির সফট কপি PDF/JPEG ফরম্যাটে রাখার নির্দেশনা রয়েছে।

৬. ১ জুলাই ২০১৫-এর Pay Fixation Verification Number

চলমান ও নতুন নিয়োগ ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখের বেতন নির্ধারণের Verification Number প্রয়োজন হতে পারে। তাই পুরোনো Pay Fixation-এর তথ্য আগে থেকেই খুঁজে রাখা উচিত।

পুরোনো বেতন নির্ধারণের কাগজপত্র না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসের রেকর্ড বা সার্ভিস বই থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ।

৭. ৩০ জুন ২০২৬-এর মূল বেতন

নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বিদ্যমান বেতন ও পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কর্মচারীর ওই তারিখের Basic Pay কত ছিল, তা বেতন বিল, সার্ভিস বই বা অফিসের বেতন রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা উচিত।

তথ্য দেওয়ার পর নতুন Basic Pay দেখা যাবে

iBAS++-এ নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করার পর আবেদন সাবমিট করার আগেই সিস্টেমে নির্ধারণযোগ্য নতুন মূল বেতনের পরিমাণ দেখানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ কারণে শুধু সিস্টেমে প্রদর্শিত অঙ্ক দেখে সঙ্গে সঙ্গে সাবমিট না করে প্রথমে ব্যক্তিগত ও চাকরির তথ্যগুলো ভালোভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

আবেদন জমা দেওয়ার পর কী হবে?

পে ফিক্সেশনের তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করে আবেদন জমা দিলে সেটি সংশ্লিষ্ট DDO-এর কাছে যাবে।

DDO প্রথমে তথ্য যাচাই করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সার্ভিস বইয়ের সঙ্গে পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনের তথ্য মিলিয়ে দেখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর আবেদন সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে যাবে। হিসাবরক্ষণ অফিস অনলাইনে তথ্য যাচাই করে বেতন নির্ধারণী বিবরণী অনুমোদন ও প্রতিপাদন করবে।

অনুমোদনের পর সিস্টেম থেকে Verification Number তৈরি হবে। সেই নম্বর ও নির্ধারিত নতুন বেতন সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

শুধু অনলাইন আবেদন করলেই প্রক্রিয়া শেষ নয়

অনেকে মনে করতে পারেন, iBAS++-এ তথ্য দিয়ে Submit করলেই পে ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়ে যাবে। বাস্তবে প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে।

কর্মচারী → iBAS++-এ তথ্য প্রদান → DDO যাচাই → হিসাবরক্ষণ অফিসের যাচাই ও অনুমোদন → Verification Number → সার্ভিস বইয়ে লিপিবদ্ধকরণ।

অর্থাৎ কর্মচারীর তথ্য পূরণের পরও অফিস পর্যায়ে যাচাই ও অনুমোদনের ধাপ রয়েছে।

ভুল তথ্য দিলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?

পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দেওয়া হলে পরবর্তী যাচাইয়ের সময় বিষয়টি ধরা পড়তে পারে এবং সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে—

  • NID নম্বর ভুল
  • জন্মতারিখে অমিল
  • মোবাইল নম্বর ভুল
  • পদ বা গ্রেড ভুল
  • যোগদানের তারিখে ভুল
  • পূর্ববর্তী চাকরির তথ্য অসম্পূর্ণ
  • পূর্ববর্তী Basic Pay ভুল
  • পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য বাদ দেওয়া
  • পূর্ববর্তী Pay Fixation Verification Number না থাকা

এসব কারণে আবেদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।

অফিসগুলোর জন্যও প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ

পে ফিক্সেশন শুধু কর্মচারীর ব্যক্তিগত প্রস্তুতির বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পদ, গ্রেড এবং জনবলের সাংগঠনিক তথ্যও iBAS++-এ সঠিকভাবে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি কার্যক্রমে উঠে এসেছে।

অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানে পদবী, অনুমোদিত গ্রেড বা সাংগঠনিক কাঠামোর তথ্য পুরোনো থাকলে তা হালনাগাদ করাও পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

নতুন বেতন কার্যকরের সঙ্গে পে ফিক্সেশনের সম্পর্ক

নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হয়েছে। তবে বর্ধিত মূল বেতনের আর্থিক সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর করার কাঠামো দেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং দশম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কার্যকর থাকার বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই হার বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ কার্যকর করার কাঠামো দেওয়া হয়েছে।

ফলে অনলাইন পে ফিক্সেশন শুধু নতুন Basic Pay নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরবর্তী বেতন বিল, বকেয়া এবং অন্যান্য আর্থিক হিসাবও সম্পর্কিত।

অক্টোবরের আগে কর্মচারীদের জন্য চূড়ান্ত চেকলিস্ট

পে ফিক্সেশন শুরু হওয়ার আগে একটি ফোল্ডারে নিচের তথ্যগুলো সাজিয়ে রাখা যেতে পারে—

ব্যক্তিগত তথ্য

  • NID
  • জন্মতারিখ
  • নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর

চাকরির তথ্য

  • নিয়োগপত্র
  • যোগদানপত্র
  • বর্তমান পদ ও গ্রেড
  • যোগদানের তারিখ
  • সার্ভিস বইয়ের তথ্য

বেতনসংক্রান্ত তথ্য

  • ৩০ জুন ২০২৬-এর Basic Pay
  • পূর্ববর্তী Pay Fixation
  • ১ জুলাই ২০১৫-এর Verification Number
  • ইনক্রিমেন্টের তথ্য
  • পদোন্নতির আদেশ
  • উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেডের তথ্য

সফট কপি

  • PDF/JPEG ফরম্যাটে প্রয়োজনীয় অফিস আদেশ
  • নতুন নিয়োগ হলে শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।

শেষ কথা

নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর পে ফিক্সেশনকে ঘিরে এখন মূল গুরুত্ব হচ্ছে সঠিক তথ্য ও সঠিক নথি প্রস্তুত রাখা। সর্বশেষ প্রকাশিত নির্দেশনায় iBAS++-এর মাধ্যমে অনলাইন আবেদন, DDO যাচাই এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের অনুমোদনের কাঠামো স্পষ্ট করা হয়েছে।

তাই অক্টোবরের কার্যক্রম শুরুর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো NID ও জন্মতারিখ মিলিয়ে দেখা, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সচল রাখা, ৩০ জুনের Basic Pay নিশ্চিত করা এবং পুরোনো বেতন নির্ধারণ ও চাকরি-সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা। পে ফিক্সেশনের নির্দিষ্ট চালুর তারিখ বা ধাপ নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য দেখা যাচ্ছে; তাই চূড়ান্ত সময়সূচি ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ, iBAS++ এবং হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নোটিশ অনুসরণ করাই নির্ভরযোগ্য।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *