Pay fixation ibas: পে ফিক্সেশন কিভাবে করতে হয়?
নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের কার্যক্রম। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইন পে ফিক্সেশন বা বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজ ৫ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে iBAS++-এর Pay Fixation ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই ও বেতন পুনর্নির্ধারণ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ কার্যক্রম ২০ অক্টোবরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অর্থ বিভাগের নির্দেশনার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরও iBAS++ Pay Fixation-sub-system-এর জন্য কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রস্তুত ও প্রেরণের উদ্যোগ নিয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪ অক্টোবরের একটি নোটিশেও জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর বেতন নির্ধারণী কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে iBAS++ Pay Fixation-sub-system-এ জনবলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
পে ফিক্সেশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর শুধু নতুন গ্রেড বা নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করলেই কর্মচারীর বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর পূর্ববর্তী মূল বেতন, গ্রেড, চাকরির তথ্য এবং নতুন বেতন কাঠামোর বিধান বিবেচনায় নিয়ে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করতে হয়। এই প্রক্রিয়াই পে ফিক্সেশন।
iBAS++ মূলত সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা। এর সঙ্গে কর্মচারীদের তথ্যভান্ডার ও পে-রোল ব্যবস্থাও যুক্ত রয়েছে এবং সিস্টেমটি কর্মচারীদের বেতন বিল প্রস্তুত ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়। iBAS++-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এর Pay Fixation সেবায় সরকারি কর্মচারীরা নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেন।
iBAS++-এ পে ফিক্সেশন করবেন যেভাবে
প্রথম ধাপ: iBAS++ Pay Fixation-এ প্রবেশ
প্রথমে iBAS++-এর নির্ধারিত Pay Fixation সেবায় প্রবেশ করতে হবে। বর্তমানে iBAS++ পোর্টালে “Pay Fixation-2026 GoB Staff – Running (Without User ID)” এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য আলাদা Pay Fixation অপশন দেখা যাচ্ছে।
অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ধরন অনুযায়ী সঠিক অপশন নির্বাচন করাই প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় ধাপ: পরিচয় যাচাই
পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়ায় কর্মচারীর পরিচয় শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। iBAS++-এর অনলাইন ফর্মে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (NID), Verification Number, নাম, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর-এর মতো তথ্যের ঘর রয়েছে।
কিছু iBAS++ অনলাইন সেবায় NID ও জন্মতারিখের পাশাপাশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে লগইন এবং মোবাইল/ই-মেইলে পাঠানো চার সংখ্যার Verification Code বা OTP দিয়ে যাচাই করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তৃতীয় ধাপ: চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই
পরিচয় যাচাইয়ের পর কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্য দিতে বা যাচাই করতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে—
- মন্ত্রণালয়/বিভাগ
- অধিদপ্তর/পরিদপ্তর
- অধস্তন অফিস বা অপারেশনাল গ্রুপ
- মাঠ পর্যায়ের অফিস/ইউনিট
- বর্তমান পদবি
- বর্তমান পদমর্যাদা
- বর্তমান স্কেল/গ্রেড
- বর্তমান মূল বেতন
iBAS++-এর বিদ্যমান Pay Fixation ফর্মেও এসব তথ্যের জন্য পৃথক ঘর রয়েছে।
চতুর্থ ধাপ: পূর্ববর্তী বেতন ও চাকরির তথ্য
পে ফিক্সেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পূর্ববর্তী বেতনসংক্রান্ত তথ্য। নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মচারীর আগের বেতন ও চাকরির ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে কোনো ভুল তথ্য দেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কার্যকর মূল বেতন, গ্রেড, পূর্ববর্তী ফিক্সেশন, ব্যক্তিগত বেতন বা প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য সংশ্লিষ্ট রেকর্ড অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—নতুন বেতন নিজে থেকে অনুমান করে বসানো উচিত নয়। iBAS++-এ যে তথ্য প্রদর্শিত হবে তা সার্ভিস রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট অফিসের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
পঞ্চম ধাপ: নতুন বেতন নির্ধারণ
প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পূরণ ও যাচাই করার পর নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী পে ফিক্সেশনের হিসাব তৈরি হবে।
এ পর্যায়ে কর্মচারীর—
পুরোনো মূল বেতন → প্রযোজ্য গ্রেড → নতুন স্কেলের ধাপ → নতুন মূল বেতন
—এই ধারাবাহিকতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
পে ফিক্সেশন শুধু নতুন বেতন দেখার বিষয় নয়; ভবিষ্যতের বেতন বিল, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং অবসরকালীন সুবিধার হিসাবেও এর প্রভাব থাকতে পারে। তাই চূড়ান্ত সাবমিশনের আগে তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Final Submit করার আগে যেসব বিষয় মিলিয়ে দেখবেন
পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করার আগে অন্তত এসব তথ্য যাচাই করা উচিত—
১. NID নম্বর ঠিক আছে কি না
২. নামের বানান সঠিক কি না
৩. জন্মতারিখ ঠিক আছে কি না
৪. মোবাইল নম্বর সঠিক কি না
৫. মন্ত্রণালয়/বিভাগ সঠিক কি না
৬. দপ্তর ও কর্মস্থলের তথ্য সঠিক কি না
৭. পদবি ও গ্রেড ঠিক আছে কি না
৮. পুরোনো মূল বেতন সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না
৯. ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রযোজ্য নতুন বেতন নির্ধারণ ঠিক হয়েছে কি না
১০. চূড়ান্তভাবে Submit করার আগে পুরো ফিক্সেশন স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না।
পে ফিক্সেশন আর বেতন পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে—পে ফিক্সেশন করলেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন বেতন ব্যাংক হিসাবে চলে আসবে। বাস্তবে বিষয়টি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথমে কর্মচারীর নতুন বেতন নির্ধারণ বা Pay Fixation হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা অফিসের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে iBAS++-এ অনুমোদিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন বিল প্রস্তুত করতে হবে।
৫ অক্টোবর থেকে পে ফিক্সেশন কার্যক্রম শুরু এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে বকেয়া পাওয়ার সম্ভাবনা
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন পার্থক্য বা বকেয়া হিসাব তৈরি হওয়ার কথা।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে ফিক্সেশন ও সংশ্লিষ্ট অফিসের কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন হলে অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে বকেয়ার পরিমাণ এক হবে না; নতুন নির্ধারিত মূল বেতন, ভাতা, কর্তন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হিসাবের ওপর চূড়ান্ত অর্থ নির্ভর করবে।
অর্থাৎ কারও বেতন বৃদ্ধি যত বেশি হবে, একই সময়ের বকেয়ার অঙ্কও সাধারণভাবে তত বেশি হতে পারে। আবার যেসব খাতে ভাতা বা কর্তনের নিয়ম আলাদা, তাদের চূড়ান্ত প্রাপ্যও আলাদা হতে পারে।
MPO শিক্ষক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকতে পারে
নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন সবার ক্ষেত্রে একই সময়ে সম্পন্ন নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি MPOভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং বিচার বিভাগীয় কর্মীদের ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই কোনো একটি শ্রেণির কর্মচারীর পে ফিক্সেশন বা বেতন প্রদানের সময়সূচি দেখে সব শ্রেণির ক্ষেত্রে একই সময় ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তথ্য ভুল হলে কী করবেন
পে ফিক্সেশনের সময় যদি NID, নাম, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড, মূল বেতন কিংবা চাকরির তথ্যের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি দেখা যায়, তাহলে অনুমান করে তথ্য পরিবর্তন করে ফাইনাল সাবমিট না করাই নিরাপদ।
প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শাখা, হিসাব শাখা বা অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নিতে হবে। কারণ iBAS++-এর পে ফিক্সেশন তথ্য পরবর্তী বেতন বিল ও আর্থিক রেকর্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শেষ কথা
নবম জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে iBAS++ Pay Fixation এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের কাজ এগিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টদের ২০ অক্টোবরের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পে ফিক্সেশন করার সময় তাড়াহুড়া না করে নিজের NID, পদ, গ্রেড, পুরোনো মূল বেতন এবং নতুন নির্ধারিত বেতন একাধিকবার যাচাই করা। কারণ একবার চূড়ান্তভাবে তথ্য জমা দেওয়ার পর কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে তা সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তাই এখন মূল করণীয় হলো—iBAS++-এ প্রবেশ, ব্যক্তিগত ও চাকরির তথ্য যাচাই, নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব পরীক্ষা এবং নির্ধারিত নিয়মে Final Submit করা।



