নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

সরকারি চাকরিজীবীদের সব ধরনের ছুটির নিয়ম ২০২৬: কত দিন ছুটি পাওয়া যায়, বেতন কেমন এবং কোন বিধিতে কী বলা আছে?

সরকারি চাকরিজীবীদের অর্জিত ছুটি, অসাধারণ ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসা ছুটি, অধ্যয়ন ছুটি, শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি, নৈমিত্তিক ছুটি, বহিঃবাংলাদেশ ছুটিসহ বিভিন্ন ধরনের ছুটির নিয়ম ও বিধির রেফারেন্স একসঙ্গে জেনে নিন।

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ছুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চাকরিসংক্রান্ত অধিকার। ব্যক্তিগত প্রয়োজন, অসুস্থতা, মাতৃত্ব, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসরের প্রস্তুতি—বিভিন্ন কারণে সরকারি কর্মচারীরা বিধি অনুযায়ী ছুটি ভোগ করতে পারেন। তবে সব ছুটির মেয়াদ, বেতন, প্রাপ্যতা এবং অনুমোদনের শর্ত এক নয়।

সরকারি কর্মচারীদের ছুটির বিষয়গুলো মূলত The Prescribed Leave Rules, 1959, Bangladesh Service Rules (BSR), Fundamental Rules এবং সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন ও আদেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারাতেও প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশ অনুসারে ছুটি প্রাপ্যতা ও ভোগের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছুটির নাম, সম্ভাব্য মেয়াদ, বেতন-সংক্রান্ত বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট বিধির রেফারেন্স নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

সরকারি চাকরিজীবীদের ছুটির ধরন একনজরে

ক্রমছুটির নামইংরেজি নাম
১অর্জিত ছুটিEarned Leave
২অসাধারণ ছুটি/বিনা বেতনে ছুটিExtraordinary Leave/Leave Without Pay
৩অক্ষমতাজনিত ছুটিSpecial Disability Leave
৪অধ্যয়ন ছুটিStudy Leave
৫সংক্রমণরোধী ছুটিQuarantine Leave
৬প্রসূতি ছুটিMaternity Leave
৭চিকিৎসালয়/হাসপাতাল ছুটিHospital Leave
৮বিশেষ অসুস্থতাজনিত ছুটিSpecial Sick Leave
৯অবকাশ বিভাগের ছুটিLeave of Vacation Department
১০বিভাগীয় ছুটিDepartmental Leave
১১প্রাপ্যতাবিহীন ছুটিLeave Not Due
১২অবসর-উত্তর ছুটিLeave Preparatory to Retirement (LPR)
১৩বাধ্যতামূলক ছুটিCompulsory Leave
১৪বহিঃবাংলাদেশ ছুটিLeave in/for Out of Bangladesh
১৫নৈমিত্তিক ছুটিCasual Leave
১৬সাধারণ ও সরকারি ছুটিPublic/Government Holiday
১৭নির্বাহী আদেশের ছুটিGovernment Holiday by Executive Order
১৮ঐচ্ছিক ছুটিOptional Holiday
১৯শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটিRest and Recreation Leave

বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরের তালিকাটি বিভিন্ন প্রচলিত ছুটির শ্রেণি ও প্রচলিত পরিভাষার সংকলন। প্রতিটি ছুটি প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য নয়। দপ্তর, চাকরির ধরন, স্থায়ী বা অস্থায়ী অবস্থান, ছুটির হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারিত হয়।

১. অর্জিত ছুটি (Earned Leave)

অর্জিত ছুটি হলো চাকরির সময়কাল ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী কর্মচারীর ছুটির হিসাবে জমা হওয়া ছুটি। সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে এটি সবচেয়ে পরিচিত ছুটিগুলোর একটি।

নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৩-এ গড় বেতন ও অর্ধগড় বেতনে ছুটির বিষয়ে বিধান রয়েছে। প্রচলিত নিয়মে স্থায়ী সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে কর্মকাল অনুযায়ী ছুটি অর্জিত হয়। তবে ছুটি জমার হার, সর্বোচ্চ জমার সীমা এবং একটানা কত দিন ছুটি মঞ্জুর করা যাবে—এসব বিষয় প্রযোজ্য উপবিধি ও সংশ্লিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভর করে।

অর্জিত ছুটির প্রধান দুটি ধরন হলো:

  • গড় বেতনে অর্জিত ছুটি: বিধি অনুযায়ী প্রাপ্যতা ও ছুটির হিসাবের ভিত্তিতে মঞ্জুর করা হয়।
  • অর্ধগড় বেতনে অর্জিত ছুটি: সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী অর্জিত ও ভোগ করা যায়।

ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রয়োজনে দীর্ঘ ছুটি, চিকিৎসা কিংবা অন্য অনুমোদিত কারণে অর্জিত ছুটির আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন করলেই ছুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মঞ্জুর হয় না; উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।

২. অসাধারণ ছুটি বা বিনা বেতনে ছুটি (Extraordinary Leave)

অর্জিত বা অন্য কোনো প্রাপ্য ছুটি দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না হলে এবং বিধিতে অনুমোদিত পরিস্থিতিতে অসাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।

এ ধরনের ছুটির ক্ষেত্রে সাধারণত ছুটিকালীন বেতন পাওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা অন্য গ্রহণযোগ্য পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে এ ছুটি দেওয়া হতে পারে।

বিধির রেফারেন্স: নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৯(৩) এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের প্রাসঙ্গিক বিধান।

তবে বিনা বেতনে ছুটি নিলে চাকরিকাল, ইনক্রিমেন্ট, পেনশনযোগ্য চাকরি বা অন্যান্য সুবিধায় কী প্রভাব পড়বে, তা ছুটির ধরন ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।

৩. অক্ষমতাজনিত ছুটি (Special Disability Leave)

সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্ঘটনা বা আঘাতের কারণে কোনো কর্মচারী অক্ষম হয়ে পড়লে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে বিশেষ অক্ষমতাজনিত ছুটির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে:

  • সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিবরণ ও প্রমাণ;
  • চিকিৎসা প্রতিবেদন বা মেডিকেল বোর্ডের মতামত;
  • দায়িত্ব পালনের সঙ্গে আঘাত বা অক্ষমতার সম্পর্কের প্রমাণ;
  • উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর বিধি ১৪৮ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য বিধান—প্রকাশিত তালিকায় উল্লিখিত রেফারেন্স অনুযায়ী।

এ ছুটির মেয়াদ ও বেতন সুবিধা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিধির সর্বশেষ প্রযোজ্য পাঠ যাচাই করা প্রয়োজন।

৪. অধ্যয়ন ছুটি (Study Leave)

সরকারি চাকরির সঙ্গে সম্পর্কিত উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট শর্তে অধ্যয়ন ছুটি দেওয়া যেতে পারে।

অধ্যয়ন ছুটি সাধারণ ছুটির মতো নয়। কর্মচারীর চাকরির ধরন, চাকরির মেয়াদ, অধ্যয়নের বিষয়, সরকারি স্বার্থ, অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযোজ্য আর্থিক শর্ত বিবেচনা করা হয়।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর অধ্যয়ন ছুটিসংক্রান্ত বিধান এবং সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন।

আবেদন করার আগে অধ্যয়নের অনুমোদন, ছুটিকালীন বেতন, চাকরিতে ফেরার শর্ত এবং প্রয়োজনে বন্ড বা অঙ্গীকারনামার বিষয়টি যাচাই করা উচিত।

৫. সংক্রমণরোধী ছুটি (Quarantine Leave)

সংক্রামক রোগের সংস্পর্শে আসা বা সংক্রমণ প্রতিরোধে কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সংক্রমণরোধী ছুটির বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে।

এ ধরনের ছুটি সাধারণ ব্যক্তিগত ছুটি থেকে আলাদা। রোগের প্রকৃতি, সংক্রমণের ঝুঁকি, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর বিধি ১৯৬ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি বা সরকারি নির্দেশনা।

ছুটির মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে রোগের ধরন ও প্রযোজ্য বিধান অনুসরণ করতে হবে।

৬. প্রসূতি ছুটি (Maternity Leave)

সরকারি নারী কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে এ ছুটি মঞ্জুর করা হয়।

প্রচলিত সরকারি চাকরিবিধির আলোচনায় মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ৬ মাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি, পূর্বে ছুটি ভোগের হিসাব, চাকরির ধরন এবং কার্যকর সরকারি আদেশ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর বিধি ১৯৭ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য বিধান।

মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করার সময় সাধারণত চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক নথি জমা দিতে হয়।

৭. চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল ছুটি (Hospital Leave)

নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মচারী এবং বিধিতে নির্ধারিত পরিস্থিতিতে চিকিৎসা বা হাসপাতাল-সংক্রান্ত বিশেষ ছুটির সুযোগ থাকতে পারে। এটি সব সরকারি কর্মচারীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়।

এ ধরনের ছুটি বিবেচনার ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব, কর্মচারীর শ্রেণি, অসুস্থতা বা আঘাতের প্রকৃতি এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর বিধি ১৯৮–২০১ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য বিধান।

হাসপাতালে ভর্তি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই বিশেষ ছুটি পাওয়া যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। কর্মচারীর ক্ষেত্রে কোন বিধান প্রযোজ্য, তা দপ্তরের প্রশাসন বা হিসাব শাখা থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৮. বিশেষ অসুস্থতাজনিত ছুটি (Special Sick Leave)

বিশেষ ধরনের অসুস্থতা, পেশাগত ঝুঁকি বা নির্দিষ্ট চাকরির ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশেষ ছুটির বিধান থাকতে পারে। তবে এটি সাধারণ চিকিৎসা ছুটির সমার্থক নয় এবং সবার জন্য প্রযোজ্যও নয়।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান এবং প্রযোজ্য বিশেষ সরকারি আদেশ।

আবেদনের ক্ষেত্রে মেডিকেল সার্টিফিকেট, চিকিৎসকের সুপারিশ, অসুস্থতার প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিবিধি অনুসরণ করা জরুরি।

৯. অবকাশ বিভাগের ছুটি (Leave of Vacation Department)

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো অবকাশভিত্তিক বিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অবকাশ ও ছুটির হিসাব সাধারণ কর্মচারীদের থেকে ভিন্ন হতে পারে।

কোনো কর্মচারী নির্ধারিত অবকাশ ভোগ করেছেন কি না, অবকাশের সময় দায়িত্ব পালন করেছেন কি না এবং তাঁর চাকরির ধরন কী—এসব বিষয় ছুটির প্রাপ্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

বিধির রেফারেন্স: নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৮ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য বিধান।

অবকাশ বিভাগের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সাধারণ কর্মচারীদের ছুটির হিসাব সরাসরি প্রয়োগ না করে নিজস্ব প্রযোজ্য বিধান যাচাই করতে হবে।

১০. বিভাগীয় ছুটি (Departmental Leave)

কিছু নির্দিষ্ট বিভাগ বা চাকরির কাঠামোয় বিশেষ ধরনের বিভাগীয় ছুটির বিধান থাকতে পারে। এ ধরনের ছুটি সর্বজনীন নয়; সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিজস্ব বিধি ও সরকারি আদেশের ভিত্তিতে প্রযোজ্য হয়।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান।

কোনো কর্মচারীর পদ বা দপ্তরে এই ছুটির বিধান কার্যকর আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শাখা থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

১১. প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি (Leave Not Due)

প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি এমন এক ধরনের ছুটি, যা নির্দিষ্ট শর্তে ভবিষ্যতে অর্জিত হওয়ার সম্ভাব্য ছুটির বিপরীতে মঞ্জুর করা যেতে পারে।

প্রকাশিত বিধির বিবরণ অনুযায়ী, নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫-এ এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। সেখানে অবসর-উত্তর ছুটির ক্ষেত্র ব্যতীত স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ১২ মাস এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়া সর্বোচ্চ ৩ মাস পর্যন্ত প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির বিধান উল্লেখ আছে।

তবে এই ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত, ছুটির হিসাব এবং পরবর্তী সময়ে চাকরিতে ফিরে আসার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিধির রেফারেন্স: নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫(১) ও ৫(২)।

১২. অবসর-উত্তর ছুটি (Leave Preparatory to Retirement—LPR)

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার আগে প্রযোজ্য বিধি ও ছুটির হিসাব অনুযায়ী যে ছুটি মঞ্জুর করা হয়, তা অবসর-উত্তর ছুটি বা এলপিআর নামে পরিচিত।

এলপিআরের ক্ষেত্রে কর্মচারীর অবসরের তারিখ, জমা ছুটির পরিমাণ, প্রযোজ্য চাকরিবিধি এবং অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৪৭ ধারায় অবসর-উত্তর ছুটির বিষয়ে বিধান রয়েছে এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট বিধান ও শর্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত ছুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিধির রেফারেন্স: সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৪৭ ধারা এবং প্রযোজ্য ছুটিবিধি।

এলপিআর মঞ্জুরের আগে ব্যক্তিগত ছুটির হিসাব ও অবসরের তারিখ সঠিকভাবে মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

১৩. বাধ্যতামূলক ছুটি (Compulsory Leave)

প্রশাসনিক বা বিধিতে নির্ধারিত বিশেষ পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক ছুটির বিষয়টি আসতে পারে। তবে একে সব সরকারি কর্মচারীর জন্য নিয়মিতভাবে প্রাপ্য সাধারণ ছুটি হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

বিধির রেফারেন্স: সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দিষ্ট বিধি, সরকারি আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা।

এই ছুটির নাম, মেয়াদ ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট আদেশের প্রকৃত ভাষ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

১৪. বহিঃবাংলাদেশ ছুটি (Leave in/for Out of Bangladesh)

বিদেশে চিকিৎসা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা অন্য অনুমোদিত কারণে ছুটি ভোগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে—ছুটি মঞ্জুর এবং বিদেশ গমনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি বা ছাড়পত্র। একটির অনুমোদন অন্যটির সব শর্ত পূরণ করে—এমন নয়।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর প্রযোজ্য বিধান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের বহিঃবাংলাদেশ ছুটিসংক্রান্ত আদেশ।

বিদেশে অবস্থানের সময়সীমা, পাসপোর্ট, ভিসা, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যাচাই করতে হবে।

১৫. নৈমিত্তিক ছুটি (Casual Leave)

নৈমিত্তিক ছুটি সাধারণত স্বল্পমেয়াদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন—জরুরি পারিবারিক কাজ, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনুপস্থিতি বা হঠাৎ দেখা দেওয়া কোনো পরিস্থিতি।

প্রচলিত সরকারি ছুটির নির্দেশনায় সাধারণভাবে একজন কর্মচারীর জন্য বছরে সর্বোচ্চ ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটির কথা উল্লেখ করা হয়। তবে একটানা কত দিন ভোগ করা যাবে, ছুটির সঙ্গে অন্য ছুটি যুক্ত করা যাবে কি না এবং কোন শ্রেণির কর্মচারীর ক্ষেত্রে কোন নির্দেশনা প্রযোজ্য—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট আদেশ অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস পার্ট-১-এর প্রাসঙ্গিক বিধান এবং নৈমিত্তিক ছুটিসংক্রান্ত সরকারি আদেশ।

নৈমিত্তিক ছুটির ক্ষেত্রে আবেদন ও অনুমোদনের নিয়ম দপ্তরভেদে অনুসরণ করতে হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে অনুপস্থিতির পর দাপ্তরিক নিয়ম অনুযায়ী অবহিত বা আবেদন করতে হবে।

১৬. সাধারণ ছুটি ও সরকারি ছুটি (Public Holiday)

সাধারণ ছুটি বলতে সরকার ঘোষিত ছুটির দিনগুলোকে বোঝানো হয়। জাতীয় দিবস, ধর্মীয় উৎসব এবং সরকার ঘোষিত অন্যান্য উপলক্ষে এসব ছুটি নির্ধারিত হতে পারে।

এ ছুটিগুলো সাধারণত সরকারি ছুটির বার্ষিক তালিকা, প্রযোজ্য আইন ও সরকারি আদেশের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।

বিধির রেফারেন্স: Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ২৫ এবং প্রযোজ্য সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন।

কোনো দপ্তরে ছুটির দিনেও জরুরি দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব বণ্টন ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হয়।

১৭. নির্বাহী আদেশের ছুটি (Government Holiday by Executive Order)

সরকার নির্বাহী আদেশে নির্দিষ্ট দিন বা উপলক্ষে ছুটি ঘোষণা করতে পারে। এ ধরনের ছুটি সাধারণ ছুটির তালিকার পাশাপাশি পৃথক সরকারি আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হতে পারে।

বিধির রেফারেন্স: সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্বাহী আদেশ ও বার্ষিক ছুটির প্রজ্ঞাপন।

কোনো দিন নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন দেখতে হবে।

১৮. ঐচ্ছিক ছুটি (Optional Holiday)

ধর্মীয় বা সামাজিক উপলক্ষের ভিত্তিতে সরকার নির্দিষ্ট শর্তে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ দিতে পারে। কর্মচারী সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদিত ঐচ্ছিক ছুটি বেছে নিতে পারেন।

তবে ঐচ্ছিক ছুটির সংখ্যা, আবেদন করার পদ্ধতি এবং কোন কর্মচারী কোন ছুটি নিতে পারবেন—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।

বিধির রেফারেন্স: সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন ও ঐচ্ছিক ছুটিসংক্রান্ত নির্দেশনা।

১৯. শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি (Rest and Recreation Leave)

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ কর্মজীবনে বিশ্রাম ও বিনোদনের সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির বিধান রয়েছে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর এ ছুটি মঞ্জুর করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি তিন বছর অন্তর ১৫ দিনের শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির কথা উল্লেখ করা হয়। তবে প্রকৃত প্রাপ্যতা, ছুটি ভোগের সময় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা প্রযোজ্য বিধি ও সরকারি আদেশ অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

বিধির রেফারেন্স: বাংলাদেশ চাকরি (বিনোদন ভাতা) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযোজ্য আদেশ।

ছুটির পাশাপাশি বিনোদন ভাতা বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার বিষয়টি পৃথক শর্তে নির্ধারিত হতে পারে। তাই ছুটি মঞ্জুরের আদেশ ও আর্থিক সুবিধার প্রযোজ্যতা একসঙ্গে যাচাই করা উচিত।

ছুটির আবেদন করার আগে সরকারি কর্মচারীদের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

১. ছুটির হিসাব যাচাই করুন: অর্জিত ছুটি বা অন্য ছুটির আবেদন করার আগে ব্যক্তিগত ছুটির হিসাবনামা পরীক্ষা করুন।

২. সঠিক বিধি উল্লেখ করুন: আবেদনপত্রে ছুটির ধরন ও প্রযোজ্য বিধির রেফারেন্স সঠিকভাবে উল্লেখ করা সহায়ক।

৩. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিন: চিকিৎসা, মাতৃত্ব, অধ্যয়ন বা বিদেশে যাওয়ার মতো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নথি সংযুক্ত করুন।

৪. অনুমোদন ছাড়া ছুটি ভোগ করবেন না: জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিশ্চিত করে ছুটিতে যাওয়া উচিত।

৫. বেতন ও চাকরিকালের প্রভাব বুঝুন: বিনা বেতনে ছুটি, প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি বা দীর্ঘমেয়াদি ছুটির ক্ষেত্রে ইনক্রিমেন্ট, চাকরিকাল ও অবসর সুবিধায় প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা যাচাই করুন।

৬. সর্বশেষ সরকারি আদেশ দেখুন: পুরোনো নির্দেশনা বা অনলাইনে প্রচলিত তালিকার সঙ্গে বর্তমান বিধানের পার্থক্য থাকতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

সরকারি চাকরিজীবীদের ছুটি সম্পর্কে শেষ কথা

বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরনের ছুটির বিধান থাকলেও সব কর্মচারী সব ধরনের ছুটি সমানভাবে পান না। ছুটির মেয়াদ, বেতন, জমা ছুটির হিসাব, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ এবং চাকরিতে প্রভাব—সবকিছু নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর চাকরির ধরন ও প্রযোজ্য বিধানের ওপর।

তাই ছুটির আবেদন করার আগে নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯, বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। কোনো ছুটির নির্দিষ্ট মেয়াদ বা আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু সংক্ষিপ্ত তালিকার ওপর নির্ভর না করে মূল বিধি ও সর্বশেষ সংশোধনী দেখা উচিত।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *