এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ১১ দফা দাবি: উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি ও বেতন বৈষম্য দূরীকরণে বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস্যা, বেতন বৈষম্য, পদোন্নতির জটিলতা এবং চাকরির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ১১ দফা দাবি। এমপিও নীতিমালা সংশোধনের মাধ্যমে এসব দাবি বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, বর্তমান নীতিমালার বিভিন্ন বিধান ও পদভিত্তিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অসংগতি থাকায় অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আর্থিক ও পেশাগতভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চাকরিতে যোগদানের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উচ্চতর গ্রেড প্রদান, এমএড ডিগ্রির জন্য অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট, প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীতকরণ, কলেজ শিক্ষকদের অনুপাত প্রথা বাতিল, ইবতেদায়ি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বাস্তবায়ন এবং গ্রন্থাগারিকদের পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি। পাশাপাশি নৈশপ্রহরীদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ ও ল্যাব সহকারীদের বেতন গ্রেডের বৈষম্য দূর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট এসব দাবি বাস্তবায়িত হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির কাঠামো, বেতন-ভাতা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এমপিও নীতিমালায় যে ১১টি সংশোধন চান শিক্ষক-কর্মচারীরা
১. চাকরিতে যোগদানের পর ৮/৬ বছরে উচ্চতর গ্রেড প্রদান
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো চাকরিতে যোগদানের পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা নির্ধারণে বিদ্যমান জটিলতা দূর করা। প্রস্তাবিত দাবিতে প্রথম উচ্চতর স্কেল এবং নবম পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৮/৬ বছর অনুযায়ী উচ্চতর স্কেল প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, একই পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও অনেক ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেড পেতে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়তে হয়। ফলে তাঁদের আর্থিক সুবিধা এবং বেতন কাঠামোর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
তাঁরা চান, চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং নির্ধারিত চাকরিকাল বিবেচনায় নিয়ে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের বিধান স্পষ্ট করা হোক। এতে দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
২. এমএড ডিগ্রির জন্য অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট
সরকারি শিক্ষকদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরও এমএড ডিগ্রি অর্জনের জন্য অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট প্রদানের দাবি উঠেছে।
শিক্ষকদের যুক্তি, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নয়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই ধরনের যোগ্যতা অর্জনের পরও সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধায় পার্থক্য থাকলে তা বৈষম্য তৈরি করে।
তাই এমএড ডিগ্রিধারী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।
৩. প্রধান শিক্ষককে ষষ্ঠ এবং সহকারী প্রধান শিক্ষককে সপ্তম গ্রেড প্রদান
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নীত করার দাবিও রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকদের ষষ্ঠ গ্রেড এবং সহকারী প্রধান শিক্ষকদের সপ্তম গ্রেড প্রদান করতে হবে।
শিক্ষকদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-কর্মচারীদের তদারকি, শিক্ষার্থীদের ফলাফল এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের ওপর বর্তায়। একইভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষককেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
অথচ দায়িত্ব ও কাজের পরিধির তুলনায় বেতন গ্রেডের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
৪. কলেজ শিক্ষকদের অনুপাত প্রথা বাতিল
কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো পদোন্নতি ও উচ্চতর পদে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত অনুপাত প্রথা বাতিল করা।
অনুপাত প্রথার কারণে অনেক যোগ্য শিক্ষক দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও কাঙ্ক্ষিত পদে পদোন্নতির সুযোগ পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
শিক্ষকদের দাবি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু নির্দিষ্ট অনুপাতের ওপর নির্ভর না করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরিকাল এবং পদভিত্তিক শূন্যপদ বিবেচনায় একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
এতে যোগ্য শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
৫. মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকদের সহকারী প্রধান বা উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ
মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত জেনারেল শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত দাবিতে মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকদের ন্যূনতম সহকারী প্রধান শিক্ষক অথবা উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদ্রাসার জেনারেল বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাদানসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক পদে যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকলে তা পেশাগত বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে।
তাই নিয়োগবিধি ও যোগ্যতার শর্ত পর্যালোচনা করে তাঁদের জন্য প্রশাসনিক পদে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
৬. ইবতেদায়ি শিক্ষকদের ১০ম ও ১৩তম গ্রেড বাস্তবায়ন
ইবতেদায়ি শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় ইবতেদায়ি শিক্ষকদের জন্য ১০ম ও ১৩তম গ্রেড বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইবতেদায়ি শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাঁদের বেতন-ভাতা ও চাকরির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবি রয়েছে।
তাঁরা মনে করেন, দায়িত্ব, যোগ্যতা ও চাকরির ধরন বিবেচনায় নিয়ে একটি সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে ১০ম ও ১৩তম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবিটি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে।
৭. প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে পূর্বের অভিজ্ঞতা বহাল রাখা
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বের অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত বিধান বহাল রাখার দাবিও রয়েছে।
শিক্ষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা একজন প্রার্থীকে দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
তাই প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বে স্বীকৃত অভিজ্ঞতার শর্ত বা সুযোগ পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
দাবিদারদের প্রত্যাশা, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ অক্ষুণ্ন রেখে নিয়োগবিধি সংশোধন করা হবে।
৮. নৈশপ্রহরীদের শ্রম আইন অনুযায়ী আট ঘণ্টা ডিউটি নির্ধারণ
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈশপ্রহরীদের কর্মঘণ্টা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দাবিতে শ্রম আইন অনুযায়ী নৈশপ্রহরীদের দৈনিক আট ঘণ্টা ডিউটি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৈশপ্রহরীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু দায়িত্বের সময়, বিশ্রাম এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে অসংগতি থাকলে তা কর্মীদের জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে।
তাই আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিশ্রামের সুযোগ এবং দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
৯. বিএড ডিগ্রিধারীদের বৈষম্য দূর করে বেতন নির্ধারণ
বিএড ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার দাবি উঠেছে।
প্রস্তাবিত দাবিতে বিএড ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে সরাসরি ১০ পে-কোডে বেতন নির্ধারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, একই ধরনের পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের পরও বেতন নির্ধারণে ভিন্নতা থাকলে তা শিক্ষকসমাজের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বিএড ডিগ্রি অর্জনের পর বেতন কাঠামো ও গ্রেড নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
তাঁরা চান, বিএড ডিগ্রির স্বীকৃতি এবং বেতন নির্ধারণের বিষয়টি এমনভাবে সংশোধন করা হোক, যাতে যোগ্যতাভিত্তিক বৈষম্য দূর হয়।
১০. কলেজের গ্রন্থাগারিকদের প্রভাষক পদে পদোন্নতির সুযোগ
কলেজে কর্মরত গ্রন্থাগারিকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য প্রভাষক পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে গ্রন্থাগারিকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান-সহায়ক পরিবেশ, তথ্য ব্যবস্থাপনা, বই ও শিক্ষা উপকরণ সংরক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কিন্তু তাঁদের জন্য পদোন্নতির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে দীর্ঘ চাকরিজীবনে পেশাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তাই যোগ্যতা, বিষয়ভিত্তিক শর্ত, অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে কলেজের গ্রন্থাগারিকদের প্রভাষক পদে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়েছে।
১১. ল্যাব সহকারীদের বেতন গ্রেড কলেজ ও মাদ্রাসায় সমতাকরণ
এমপিওভুক্ত কলেজ ও মাদ্রাসার ল্যাব সহকারীদের বেতন গ্রেডের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার দাবিও ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একই ধরনের দায়িত্ব ও কাজের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে বেতন গ্রেডের পার্থক্য থাকলে তা বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
ল্যাব সহকারীরা বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবহারিক কার্যক্রম পরিচালনা, পরীক্ষাগারের যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষায় সহায়তা করেন।
তাই কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত ল্যাব সহকারীদের পদ, যোগ্যতা, দায়িত্ব ও চাকরির ধরন বিবেচনায় নিয়ে বেতন গ্রেড সমতাকরণের দাবি জানানো হয়েছে।
১১ দফা দাবি বাস্তবায়িত হলে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে
শিক্ষকদের উত্থাপিত দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো মূলত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রথমত, বেতন ও আর্থিক সুবিধা: উচ্চতর গ্রেড, অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট, বিএড ও এমএড ডিগ্রির স্বীকৃতি এবং ইবতেদায়ি শিক্ষকদের গ্রেড বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেতন কাঠামোর উন্নয়ন প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন: প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড উন্নীতকরণ, কলেজ শিক্ষকদের অনুপাত প্রথা বাতিল এবং গ্রন্থাগারিকদের প্রভাষক পদে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির দাবি রয়েছে।
তৃতীয়ত, পেশাগত বৈষম্য দূরীকরণ: সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য কমানো এবং কলেজ-মাদ্রাসার সমপদে কর্মরত কর্মীদের বেতন গ্রেডে সমতা আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
চতুর্থত, নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামো: মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রাখার দাবি রয়েছে।
পঞ্চমত, কর্মপরিবেশ ও শ্রম অধিকার: নৈশপ্রহরীদের আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নির্ধারণের মাধ্যমে কর্মপরিবেশে শৃঙ্খলা ও আইনসম্মত দায়িত্ব বণ্টনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এমপিও নীতিমালা সংশোধনে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দাবিগুলো?
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা দেশের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে শিক্ষার মানের সম্পর্ক রয়েছে।
একজন শিক্ষক যদি দীর্ঘদিন একই পদে থেকে পদোন্নতির সুযোগ না পান, অথবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরও প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা না পান, তাহলে তাঁর পেশাগত প্রেরণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, শিক্ষক পদোন্নতি এবং কর্মচারীদের বেতন গ্রেডে অসংগতি থাকলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই এমপিও নীতিমালা সংশোধনের সময় শুধু বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নয়, বরং সামগ্রিক চাকরির কাঠামো, পদোন্নতি, যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বাস্তবায়নে কী কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে?
১১ দফা দাবি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
১. উচ্চতর গ্রেড প্রদানের ক্ষেত্রে চাকরিকাল গণনা, পূর্ববর্তী সুবিধা এবং নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য নির্ধারণ।
২. বিএড ও এমএড ডিগ্রির বিপরীতে ইনক্রিমেন্ট ও বেতন গ্রেড নির্ধারণে সুস্পষ্ট যোগ্যতার শর্ত তৈরি।
৩. পদোন্নতির ক্ষেত্রে শূন্যপদ, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নিয়োগবিধির মধ্যে সমন্বয়।
৪. কলেজ ও মাদ্রাসার সমপদে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন গ্রেডের পার্থক্য পর্যালোচনা।
৫. অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ এবং সরকারি বাজেটের সক্ষমতা বিবেচনা।
৬. সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠন, শিক্ষা প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সংশোধনী প্রণয়ন।
শেষ কথা
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ১১ দফা দাবি মূলত বেতন বৈষম্য নিরসন, পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, পদোন্নতির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং চাকরির সুযোগ-সুবিধা সমন্বয়ের একটি সম্মিলিত প্রত্যাশা। দাবিগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় সরাসরি আর্থিক সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কিছু বিষয় নিয়োগবিধি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত।
এখন দেখার বিষয়, এমপিও নীতিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রে এসব দাবি কতটা গুরুত্ব পায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন কোন বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে উল্লেখ্য, আলোচ্য ১১ দফা হলো শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবির তালিকা। এগুলো সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অনুমোদিত সংশোধনী কিংবা কার্যকর বিধান হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই। বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন প্রয়োজন।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা, নতুন নীতিমালা প্রণয়নের সময় তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত চাকরি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।



