ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে নতুন পে ফিক্সেশন: কীভাবে নির্ধারিত হবে সরকারি চাকুরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেল?
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জোর প্রস্তুতি চলছে। এবারের পে-স্কেলে বেতন নির্ধারণ বা “পে ফিক্সেশন” প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত নিয়মের বাইরে এবার ‘ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি’ অনুসরণের মাধ্যমে নতুন স্কেলে মূল বেতন বা বেসিক নির্ধারণের একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ববর্তী অর্জিত ইনক্রিমেন্ট বা অভিজ্ঞতাকে যৌক্তিকভাবে নতুন স্কেলে সমন্বয় করা।
দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল এবং সেখানে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা ধরনের কৌতূহল ও আলোচনা চলছিল। প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নতুন পদ্ধতিতে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বর্তমান বেতন এবং তার স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের অনুপাত বা “ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর” বের করে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সাথে গুণ করা হবে। এর ফলে প্রত্যেকে তাদের চাকরির সিনিয়রিটি বা ইনক্রিমেন্টের সংখ্যার ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে নতুন স্কেলেও উচ্চতর ধাপে বেতন পাবেন।
ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতি কী এবং কীভাবে কাজ করবে?
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতিতে প্রথমে একজন চাকুরিজীবীর বর্তমান মূল স্কেল এবং তিনি ঠিক কতটি ইনক্রিমেন্ট পেয়ে বর্তমানে কোন অবস্থানে আছেন তা বিবেচনায় নেওয়া হয়। বর্তমান মূল বেতনকে সেই গ্রেডের শুরুর বেসিক দিয়ে ভাগ করে একটি ‘ফ্যাক্টর’ বা গুণক সংখ্যা বের করা হয়। পরবর্তীতে নতুন পে-স্কেলে ওই গ্রেডের জন্য নির্ধারিত প্রারম্ভিক বেতনের সাথে উক্ত ফ্যাক্টর গুণ করা হয়। গুণফলটি যদি নতুন স্কেলের কোনো নির্দিষ্ট ধাপের সাথে হুবহু মিলে যায়, তবে সেটাই হবে তার নতুন বেতন। আর যদি হুবহু না মিলে, তবে তার ঠিক পরবর্তী উচ্চতর ধাপে (নিকটতম উচ্চ ধাপে রাউন্ড করে) বেতন ফিক্সেশন করা হবে।
তথ্যানুযায়ী একটি বাস্তব উদাহরণ: ধরুন, গ্রেড ১০-এর একজন কর্মকর্তার মূল স্কেল বা প্রারম্ভিক বেতন ১৬,০০০/- টাকা। তিনি চাকরিকালীন সময়ে ১টি ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, যার ফলে বর্তমানে তার স্কেলের বেসিক বা মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ১৬,৮০০/- টাকা।
ধাপ ১ (ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর নির্ণয়): বর্তমান মূল বেতন ÷ গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন অর্থাৎ,
১৬,৮০০ ÷ ১৬,০০০ = ১.০৫ধাপ ২ (নতুন স্কেলে প্রাথমিক হিসাব): ধরা যাক নতুন পে-স্কেলে ১০ম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৩২,০০০/- টাকা। তাহলে নতুন স্কেলের প্রাথমিক বেসিক হবে:
৩২,০০০ × ১.০৫ = ৩৩,৬০০/- টাকাধাপ ৩ (চূড়ান্ত পে ফিক্সেশন): নতুন স্কেলের চার্টে যদি এই ৩৩,৬০০/- টাকা সুনির্দিষ্ট ধাপ হিসেবে না থাকে, তবে চার্টের নিকটতম উচ্চ ধাপে রাউন্ড করা হবে। এই রাউন্ডকৃত অর্থই হবে তার চূড়ান্ত নতুন পে-ফিক্সেশন।
নতুন পদ্ধতির সুফল ও কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইনক্রিমেন্ট ফ্যাক্টর পদ্ধতিটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও বৈষম্যহীন। এর ফলে যারা দীর্ঘ সময় ধরে একই গ্রেডে চাকরি করছেন এবং একাধিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, তারা নতুন স্কেলেও তাদের সিনিয়রিটির পূর্ণ সুবিধা ধরে রাখতে পারবেন। কোনো কর্মচারীই তার প্রাপ্য ইনক্রিমেন্ট থেকে বঞ্চিত হবেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, “এই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ করলে হিসাব-নিকাশ অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হয়। ডিজিটাল পে-ফিক্সেশন সিস্টেমে এই সূত্রটি যুক্ত করে দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রত্যেকের নতুন বেতন নির্ধারিত হয়ে যাবে, ফলে কোনো ধরনের মানবিক ভুলের বা জটিলতার সুযোগ থাকবে না।”
সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেও এই পদ্ধতি নিয়ে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। তাদের মতে, এর আগে পে-স্কেল দেওয়ার পর ফিক্সেশন নিয়ে যে জটিলতা ও ধোঁয়াশা তৈরি হতো, এই গাণিতিক ফর্মুলার স্পষ্টতার কারণে তা অনেকটাই দূর হবে। এখন সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য।


