উন্নয়ন খাত থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর : টাইম স্কেল ও আর্থিক সুবিধার টানাপোড়েন নিরসনে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা
বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করার পর রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হওয়া হাজার হাজার কর্মচারীর এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের টাইম স্কেল ও আর্থিক সুবিধার হিসাব। উন্নয়নকালীন চাকরির সময়কালকে চাকরির ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা।
টাইম স্কেল ও আর্থিক সুবিধার জটিলতা
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মচারীদের চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার কথা থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দপ্তরের দেওয়া আদেশে বলা হচ্ছে, আর্থিক সুবিধার হিসাব শুধুমাত্র রাজস্ব খাতে যোগদানের তারিখ থেকে করা হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পকালীন সময়ে প্রাপ্ত টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেডকে রাজস্বকালীন সুবিধার সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।
অনেক কর্মচারী যারা ২০০৪ বা ২০০৫ সালে রাজস্বভুক্ত হয়েছেন, তারা এখন ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলছেন, “প্রকল্পকালীন সময়কে যদি চাকরির ধারাবাহিকতা হিসেবে ধরা হয়, তবে কেন টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের আর্থিক সুবিধা শুধুমাত্র রাজস্বভুক্তির পর থেকে গণনা করা হবে?”
আইনি লড়াই ও আদালতের অবস্থান
২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, প্রকল্পকালীন সময়কে নিয়মিত হিসেবে গণ্য করে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার অধিকার কর্মচারীদের রয়েছে। আদালতের এই ইতিবাচক অবস্থানের পরেও, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিপত্র বা স্পষ্টীকরণের অভাবে মাঠ পর্যায়ে চরম বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।
কর্মচারীদের দাবি, যখন প্রকল্পের নিয়ম ও রাজস্ব খাতের নিয়মের মধ্যে ভিন্নতা থাকে, তখন সমন্বয় করার দায়ভার সরকারের। বিশেষ করে, যাদের নিয়োগ স্কেলভিত্তিক ছিল, তাদের ক্ষেত্রে উন্নয়নের সময়কার চাকরির মেয়াদকে পূর্ণাঙ্গ সেবার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।
চুক্তিভিত্তিক বনাম স্কেলভিত্তিক নিয়োগের গোলকধাঁধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের নিয়োগ সরাসরি স্কেলভিত্তিক ছিল, তাদের চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার আইনি ভিত্তি মজবুত। কিন্তু যারা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের বিষয়টি আরও জটিল। সরকারি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যদি দ্রুত এর একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি না করে, তবে একদিকে যেমন কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অর্জিত আর্থিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, অন্যদিকে দাপ্তরিক জটিলতায় স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে।
সমস্যার দ্রুত সমাধান সময়ের দাবি
বর্তমানে প্রকল্প ও রাজস্ব চাকরির জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ এবং এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী কর্মচারীদের মতে, সরকারের উচিত দ্রুত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সভা আয়োজন করে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা:
১. প্রকল্পকালীন সময় গণনা: উন্নয়নকালীন সময়কে চাকরির মোট মেয়াদে গণনা করার একটি চূড়ান্ত গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করা।
২. আর্থিক সমন্বয়: পূর্বে প্রাপ্ত টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেডের সাথে বর্তমান নিয়মের সামঞ্জস্য বিধান করা, যাতে কোনো কর্মচারী আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হন।
৩. জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ: প্রকল্প ও রাজস্ব খাতের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে একটি অভিন্ন ও গ্রহণযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন।
উপসংহার
সরকারি কর্মচারীদের মনোবল ও কর্মস্পৃহা অটুট রাখতে উন্নয়ন খাত থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মীদের এই দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হওয়া জরুরি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি আদালতের রায়ের আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী পরিপত্র জারি করে, তবেই এই জটিলতার অবসান সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সকলে এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঠিক দিকনির্দেশনার দিকে তাকিয়ে আছেন।
আপনার জন্য পরামর্শ: আপনি যেহেতু জানতে চেয়েছেন ২০১২ সালের পরে আরেকটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়া সম্ভব কি না, সেটির উত্তর নির্ভর করছে আপনি এর আগে কয়টি টাইম স্কেল পেয়েছেন এবং আপনার বর্তমান পে-স্কেল অনুযায়ী আপনার ‘ক্যারিয়ার প্রগ্রেশন’ বা উচ্চতর গ্রেডের শর্তাবলী পূরণ হয়েছে কি না তার ওপর। যেহেতু প্রশাসনিক পরিপত্র প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, তাই আপনার দপ্তরের অফিস আদেশের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড’ সংক্রান্ত সর্বশেষ ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের আদেশগুলো (যেমন: আর্থিক বিধিমালা ও প্রজ্ঞাপন) ভালো করে যাচাই করে দেখা উচিত।


