নানাভাই–নানুর মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন কে পাবেন? কী বলছে বিধিমালা, কী নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি
সরকারি চাকরিজীবীদের মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন (Family Pension) কে পাবেন, কতদিন পর্যন্ত পাবেন এবং স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর পর সেই পেনশন অন্য উত্তরাধিকারীর কাছে যাবে কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে ভিন্ন ভিন্ন মতামত দেওয়ায় বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে।
সম্প্রতি এমনই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। একজন জানতে চান, তার নানাভাই প্রায় ৯ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর তার নানু পারিবারিক পেনশন পেয়ে আসছিলেন। এখন নানুও মারা গেছেন। তার মা, যার বয়স প্রায় ৪০ বছর এবং স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই কিন্তু আইনগতভাবে তালাক হয়নি—তিনি কি অবশিষ্ট পারিবারিক পেনশন পাবেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, পারিবারিক পেনশনের মোট মেয়াদ ১৫ বছর হওয়ায় অবশিষ্ট ৬ বছর মেয়ে পেতে পারেন। আবার কেউ বলেছেন, ৪০ বছর বয়সী বিবাহিত কন্যার পেনশন পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কেউ কেউ প্রতিবন্ধিতা, তালাক কিংবা পরিবারের বড় সন্তান হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
বিধিমালায় কী বলা আছে?
পেনশন সহজীকরণ বিধিমালা, ২০২০ অনুযায়ী পারিবারিক পেনশন প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার অনুসরণ করা হয়। বিধিমালার আওতায় সাধারণভাবে—
- সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর প্রথমে জীবিত স্বামী বা স্ত্রী পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকারী হন।
- নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান, প্রতিবন্ধী সন্তান বা বিধিমালায় উল্লেখিত অন্যান্য যোগ্য উত্তরাধিকারী পারিবারিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
- কেবলমাত্র মৃত কর্মচারীর প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত কন্যা হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিধান নেই।
- তালাকপ্রাপ্ত, বিধবা বা প্রতিবন্ধী সন্তানের ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত ও যোগ্যতা প্রযোজ্য হতে পারে।
১৫ বছরের বিষয়টি কী?
অনেকেই মনে করেন, পারিবারিক পেনশন শুরু হওয়ার পর মোট ১৫ বছর পরিবারের যে কেউ পর্যায়ক্রমে পেতে পারেন। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
বিধিমালায় ১৫ বছরের মেয়াদ থাকলেও, সেই সময়ের মধ্যে যে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশন পাবেন—এমন কোনো সাধারণ বিধান নেই। প্রতিটি উত্তরাধিকারীর ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, বয়স, প্রতিবন্ধিতা এবং বিধিমালায় নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত বিবেচনা করা হয়।
অর্থাৎ, স্ত্রী মারা গেলে অবশিষ্ট সময় প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত কন্যা অবশ্যই পাবেন—এমন সিদ্ধান্ত আইনসম্মত নয়।
তালাক না হলে কী হবে?
আইনগতভাবে তালাক কার্যকর না হলে কেবল আলাদা বসবাস বা দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকার কারণে কাউকে তালাকপ্রাপ্ত হিসেবে গণ্য করা হয় না। ফলে শুধুমাত্র দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকাকে পারিবারিক পেনশনের যোগ্যতার ভিত্তি হিসেবে ধরা যায় না।
তাহলে কী করবেন?
এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে উচিত—
- পেনশন সহজীকরণ বিধিমালা, ২০২০ অনুযায়ী নিজের যোগ্যতা যাচাই করা।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ ও মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের (এজি) কার্যালয়ে আবেদন বা পরামর্শ নেওয়া।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতামতের ওপর নির্ভর না করে সরকারি কর্তৃপক্ষের লিখিত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পেনশন-সংক্রান্ত বিষয়ে সামান্য তথ্যের পার্থক্যেও আইনি অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে। তাই কেবল মৌখিক পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এজি অফিস থেকে লিখিত মতামত নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায় বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্রষ্টব্য: প্রতিটি মামলার পারিবারিক অবস্থা, উত্তরাধিকারীর যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা এবং সরকারি নথির তথ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই প্রদান করবে।



