স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৫ : সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিবর্তন ও বিশ্লেষণ
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্গঠন করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় বেতনস্কেল থেকে শুরু করে ২০১৫ সালের অষ্টম বেতনস্কেল পর্যন্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি দশকেই সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ উভয় গ্রেডেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
বিশেষ করে সর্বোচ্চ গ্রেডের (গ্রেড-১, যা সাধারণত নির্ধারিত বা ফিক্সড থাকে) বেতনের দিকে তাকালে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের এক বিশাল রূপান্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দশকের ব্যবধানে বেতন বৃদ্ধির চিত্র (সর্বোচ্চ গ্রেড-১ এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ):
সত্তরের দশক (১৯৭৩ ও ১৯৭৭): ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় বেতনস্কেলে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন নির্ধারিত ছিল মাত্র ২,০০০ টাকা। মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে ১৯৭৭ সালের বেতনস্কেলে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩,০০০ টাকায়।
আশির দশক (১৯৮৫): আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে সরকারি কর্মচারীদের বেতন এক লাফে দ্বিগুণ করা হয়। ১৯৮৫ সালের স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারিত হয় ৬,০০০ টাকা।
নব্বইয়ের দশক (১৯৯১ ও ১৯৯৭): ১৯৯১ সালে সর্বোচ্চ বেতন প্রথমবারের মতো চার অঙ্কের ঘর পেরিয়ে ১০,০০০ টাকায় পৌঁছায়। এর ৬ বছর পর, ১৯৯৭ সালে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৫,০০০ টাকায় উন্নীত হয়।
দুই হাজার দশক (২০০৫ ও ২০০৯): নতুন শতাব্দীতে পদার্পণের পর ২০০৫ সালের স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন ২৩,০০০ টাকা এবং চার বছর পর ২০০৯ সালের স্কেলে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৪০,০০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ রূপান্তর (২০১৫): ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতনস্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসে। এই স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন প্রায় শতভাগ বৃদ্ধি পেয়ে ৪০,০০০ টাকা থেকে এক লাফে ৭৮,০০০ টাকায় (নির্ধারিত) পৌঁছায়।
বেতন কাঠামোর গ্রেড বিন্যাস ও রূপান্তর
উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সময়ের সাথে সাথে শুধু বেতনের পরিমাণই বাড়েনি, বরং গ্রেডের সংখ্যা ও বিন্যাসেও পরিবর্তন এসেছে।
গ্রেড বা ধাপের সংখ্যা: ১৯৭৩ সালের প্রথম স্কেলে মাত্র ১০টি ধাপের দেখা মিললেও, ১৯৭৭ সালের স্কেল থেকেই তা বর্তমানের ২০টি গ্রেডের (১ থেকে ২০ নং ক্রমিক) আধুনিক কাঠামোতে রূপ নেয়।
সর্বনিম্ন ধাপের (গ্রেড-২০) পরিবর্তন: ১৯৭৭ সালে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন যেখানে ছিল মাত্র ২২৫ থেকে ৩১৫ টাকা, ২০১৫ সালের স্কেলে এসে সেই ২০ নম্বর গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারিত হয়েছে ৮,২৫০ থেকে ২০,০১০ টাকা।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৯৭৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেতনস্কেলের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ কেবল টাকার অঙ্কে বেতন বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখার একটি রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা। বিশেষ করে ২০০৯ এবং ২০১৫ সালের বেতন বৃদ্ধির হার ছিল চোখে পড়ার মতো, যা সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের আকর্ষণ করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল ঘোষণা না হলেও, ২০১৫ সালের এই ঐতিহাসিক স্কেলটিই বর্তমানে দেশের সরকারি খাতের আর্থিক কাঠামোর প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।



