নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হলে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক কীভাবে ১–৪ দিনের ছুটি নেবেন?

নিজের অসুস্থতা, পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দেখাশোনা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ছুটির ধরন এক নয়। ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি ইতোমধ্যে ভোগ করা হলে পরবর্তী ১–৪ দিনের ছুটির ক্ষেত্রে কোন ছুটি প্রযোজ্য হবে—তা নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষ করে কোনো শিক্ষক চলতি বছরে পারিবারিক অসুস্থতার কারণে নৈমিত্তিক ছুটির প্রায় পুরোটা বা পুরো ২০ দিন ব্যবহার করে ফেললে পরবর্তীতে আবার এক বা একাধিক দিনের ছুটির প্রয়োজন হলে তিনি কি আবার নৈমিত্তিক ছুটি নিতে পারবেন, নাকি অর্জিত ছুটি, চিকিৎসাজনিত ছুটি কিংবা শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি নিতে হবে—এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান ও সরকারি আদেশ অনুযায়ী ছুটি প্রাপ্য ও ভোগ করতে পারবেন। অর্থাৎ ছুটি নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ছুটির প্রাপ্যতা এবং বিধি অনুসরণ করতে হবে।

বছরে নৈমিত্তিক ছুটি ২০ দিন

সরকারি কর্মচারীদের নৈমিত্তিক ছুটির পরিমাণ বর্তমানে বছরে মোট ২০ দিন হিসেবে প্রচলিত। ১৯৮৪ সালের সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশে নৈমিত্তিক ছুটির পরিমাণ ১৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়েছিল।

সরকারি শিক্ষক বাতায়নে প্রকাশিত নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মচারী পঞ্জিকাবর্ষে সর্বমোট ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করতে পারেন এবং সাধারণভাবে একসঙ্গে ১০ দিনের বেশি নৈমিত্তিক ছুটি দেওয়া যায় না।

অর্থাৎ একজন শিক্ষক যদি ইতোমধ্যে চলতি বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ভোগ করে থাকেন, তাহলে একই পঞ্জিকাবর্ষে আরও ১–৪ দিনের ছুটিকে নতুন করে নৈমিত্তিক ছুটি হিসেবে নেওয়ার সুযোগ সাধারণ নিয়মে থাকে না।

এখানেই পরবর্তী ছুটির ধরন নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


তাহলে এখন ১ দিন বা ২ দিনের ছুটি কীভাবে নেওয়া যাবে?

ধরা যাক, একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবার অসুস্থতার কারণে চলতি বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি নিয়েছেন। এখন আবার বাবার চিকিৎসা বা পারিবারিক প্রয়োজনে একদিন ছুটি দরকার হলো।

এ ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে তাঁর ছুটি হিসাবে অন্য কোনো ছুটি প্রাপ্য আছে কি না।

নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়ে গেলে প্রাপ্যতার ভিত্তিতে অর্জিত ছুটি (Earned Leave) নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারি ছুটি বিধানের অধীনে অর্জিত ছুটি মূলত কর্মকালীন সময়ে অর্জিত হয় এবং তা পূর্ণ গড় বেতনে ও অর্ধ গড় বেতনে—দুই ধরনের হতে পারে। নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর ব্যাখ্যায় স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর পূর্ণ গড় বেতনের ছুটি কর্মকালীন সময়ের ভিত্তিতে অর্জিত হয়; অর্ধ গড় বেতনের ছুটিও আলাদাভাবে অর্জিত হয়।

তাই নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর এক বা দুই দিনের ছুটি প্রয়োজন হলে, ছুটি হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি থাকলে সেটি ব্যবহার করার আবেদন করা যেতে পারে।


৩–৪ দিনের ছুটির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম?

হ্যাঁ, মূল বিষয়টি দিনের সংখ্যা নয়; বরং কোন ধরনের ছুটি প্রাপ্য এবং ছুটির কারণ কী—সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

নৈমিত্তিক ছুটির ২০ দিন শেষ হয়ে গেলে ৩ বা ৪ দিনের ছুটির প্রয়োজন হলেও সেটিকে শুধু ‘কয়েক দিনের ছুটি’ হিসেবে আবার নৈমিত্তিক ছুটিতে দেখানোর সুযোগ নেই।

ছুটি হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি থাকলে অর্জিত ছুটির আবেদন করা যেতে পারে। সরকারি দপ্তরের ছুটি-সংক্রান্ত সেবা তথ্যেও অর্জিত ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ছুটির হিসাব/প্রাপ্যতার তথ্যের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।


‘মেডিকেল ছুটি’ বললেই কি ছুটি পাওয়া যাবে?

এখানে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়।

অনেকে মনে করেন, অসুস্থতার কারণে ছুটি হলেই সেটি ‘মেডিকেল ছুটি’। কিন্তু নিজের অসুস্থতা এবং পরিবারের অন্য সদস্যের অসুস্থতা—দুটি বিষয় এক নয়।

যদি শিক্ষক নিজেই অসুস্থ হন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কর্মস্থলে উপস্থিত হতে না পারেন, তাহলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র/মেডিকেল সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ছুটির ব্যবস্থা হতে পারে।

সরকারি ছুটি ব্যবস্থায় চিকিৎসকের চিকিৎসা বা পরামর্শপত্র প্রয়োজন হতে পারে—এমন বিষয় সরকারি সেবাতথ্যেও উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্নে যে পরিস্থিতি বলা হয়েছে—বাবা অসুস্থ, তাই মা তাঁকে দেখাশোনার জন্য ছুটি নেবেন—এটি মায়ের নিজের অসুস্থতার চিকিৎসা ছুটি নয়।

সুতরাং শুধু বাবার অসুস্থতার কারণে মায়ের নামে ‘মেডিকেল ছুটি’ দেখানো যথাযথ হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্য ছুটির ধরন, বিশেষ করে অর্জিত ছুটির প্রাপ্যতা, যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি থাকলে কি নেওয়া যাবে?

আরেকটি সম্ভাব্য বিষয় হলো শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি।

সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যবধানে প্রাপ্য হয়। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর পরপর ১৫ দিনের শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি এবং সংশ্লিষ্ট বিনোদন ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে এটি সাধারণ অর্থে ‘যখন খুশি ১ দিন বা ২ দিন’ নেওয়ার ছুটি নয়। ছুটির প্রাপ্যতা, পূর্বে কখন এই ছুটি ভোগ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।

সরকারি মাইগভ সেবাতেও শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটির ক্ষেত্রে ছুটি প্রাপ্যতার প্রত্যয়ন এবং পূর্বে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি মঞ্জুরের আদেশের কপি চাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

তাই শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি প্রাপ্য থাকলে এবং সময়সীমা পূরণ হয়ে থাকলে সেটি বিধি অনুযায়ী নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু শুধু ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষ হয়েছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি পাওয়া যাবে—এমন নয়।


অর্জিত ছুটির হিসাব কীভাবে হয়?

অর্জিত ছুটির ক্ষেত্রে সরকারি বিধানে নির্দিষ্ট হিসাব রয়েছে।

নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯ অনুযায়ী স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর প্রতি ১১ দিন কর্মকালীন সময়ের জন্য ১ দিন পূর্ণ গড় বেতনে ছুটি অর্জিত হওয়ার বিধান রয়েছে এবং এই ধরনের ছুটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জমা হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতি ১২ দিন কর্মকালীন সময়ের জন্য ১ দিন অর্ধ গড় বেতনে ছুটি অর্জনের বিধানও রয়েছে।

এ কারণে কোনো শিক্ষক দীর্ঘদিন চাকরি করে থাকলে তাঁর ছুটি হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি জমা থাকার সম্ভাবনা থাকে। তবে প্রকৃত কত দিন ছুটি নেওয়া যাবে, সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ব্যক্তিগত ছুটি হিসাব না দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।


২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার পর করণীয় কী?

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো—

প্রথমে: বিদ্যালয়ের ছুটি রেজিস্টার/ছুটি হিসাব দেখে চলতি বছরে নৈমিত্তিক ছুটির অবশিষ্ট দিন আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত: যদি ২০ দিন পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে নৈমিত্তিক ছুটির পরিবর্তে অর্জিত ছুটি প্রাপ্য আছে কি না দেখতে হবে।

তৃতীয়ত: নিজের অসুস্থতার কারণে ছুটি হলে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রযোজ্য চিকিৎসাজনিত ছুটির বিধান অনুসরণ করতে হবে।

চতুর্থত: শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি প্রাপ্য হয়ে থাকলে সেটির প্রাপ্যতার সময় ও পূর্ববর্তী ভোগের তথ্য যাচাই করতে হবে।

পঞ্চমত: যে ছুটিই নেওয়া হোক না কেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকা উচিত নয়। সরকারি চাকরি আইনে ছুটি প্রাপ্যতা ও ভোগ প্রযোজ্য বিধি ও সরকারি আদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।


এক নজরে সিদ্ধান্ত

পরিস্থিতিসম্ভাব্য ব্যবস্থা
বছরে ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি এখনো শেষ হয়নিঅবশিষ্ট নৈমিত্তিক ছুটি
২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি শেষপ্রাপ্যতা থাকলে অর্জিত ছুটি
শিক্ষক নিজে অসুস্থপ্রযোজ্য চিকিৎসাজনিত ছুটি/অর্জিত ছুটি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ
বাবা/মা/পরিবারের সদস্য অসুস্থনিজের মেডিকেল ছুটি হিসেবে দেখানো যাবে না; প্রযোজ্য ছুটি বিবেচনা করতে হবে
শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি প্রাপ্যবিধি ও অনুমোদন সাপেক্ষে শ্রান্তি ও বিনোদন ছুটি
কোনো ছুটিই প্রাপ্য নেইকর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রযোজ্য অন্য ছুটির বিধান দেখতে হবে

শেষ কথা

সুতরাং, চলতি বছরে আপনার আম্মু যদি সত্যিই ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি ইতোমধ্যে ভোগ করে থাকেন, তাহলে আবার ১–৪ দিনের প্রয়োজন হলেই নতুন করে নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়া যাবে—এমন নয়। প্রথমে তাঁর ছুটি হিসাবে কী পরিমাণ অর্জিত ছুটি জমা আছে সেটি যাচাই করা উচিত।

আর বাবার অসুস্থতার কারণে তাঁকে দেখাশোনা করার জন্য ছুটি প্রয়োজন হলে সেটিকে মায়ের নিজের ‘মেডিকেল ছুটি’ হিসেবে দেখানো সঠিক পদ্ধতি নয়। বরং প্রাপ্য অর্জিত ছুটি বা অন্য কোনো প্রযোজ্য ছুটির বিধান অনুযায়ী আবেদন করা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছুটির নামের চেয়ে ছুটির প্রকৃত কারণ, ছুটি হিসাবের প্রাপ্যতা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি বিষয়ই চূড়ান্ত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রচলিত নির্দেশনা ও ছুটি হিসাব অনুযায়ী আবেদন করাই নিরাপদ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *