নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে তিন ধাপের পরিকল্পনা, ১ জুলাই থেকে শুরুর আভাসে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আশাবাদ
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যেই আশার আলো দেখছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের একটি প্রাথমিক রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং বাজেটের ওপর সম্ভাব্য অতিরিক্ত চাপ বিবেচনায় নিয়ে একবারে নয়, বরং তিন ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ সংস্থানের পরিকল্পনা রাখা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার খবর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর্মচারীদের মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি কার্যকর করা হতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে অবশিষ্ট মূল বেতন সমন্বয় করা হবে। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এককালীন বিপুল আর্থিক চাপ এড়াতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই কৌশল সরকারের জন্য তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হতে পারে।
কমতে পারে বেতন বৈষম্য
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই বেতন বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ। প্রস্তাবনায় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান বর্তমানের ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য এই ধরনের পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নতুন যাতায়াত ভাতা চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমান সময়ে জ্বালানি, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সে কারণে নতুন ভাতা কাঠামো বাস্তবায়িত হলে তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সুবিধা পাবেন প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী
নতুন পে-স্কেলের প্রভাব শুধু কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর আওতায় দেশের প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীও উপকৃত হতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশেষ করে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে তুলনামূলক কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নতুন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মহার্ঘ ভাতার ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করছে কমিটি
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চালু থাকা ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—মহার্ঘ ভাতাকে নতুন মূল বেতনের সঙ্গে একীভূত করা হবে, নাকি আলাদা সুবিধা হিসেবে রাখা হবে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানা যায়নি।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা
তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, নতুন পে-স্কেল নিয়ে এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তার বেশিরভাগই বিভিন্ন সূত্র ও গণমাধ্যমভিত্তিক। সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।
তবুও দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সম্ভাবনা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোর্স: বাংলাভিশন


