বাবার পেনশনের উত্তরাধিকারী হতে পারবেন কি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধী হওয়া সন্তান? বিধান নিয়ে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি
সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুর পর তার পরিবার ফ্যামিলি পেনশনের আওতায় আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে পেনশনভোগী মায়ের মৃত্যুর পর প্রাপ্তবয়স্ক ও পরে প্রতিবন্ধী হওয়া সন্তান পেনশনের উত্তরাধিকারী হতে পারবেন কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও ভিন্নমত।
সম্প্রতি এ ধরনের একটি ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। একজন ব্যক্তি জানান, তার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন এবং ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকে তার মা ফ্যামিলি পেনশন পাচ্ছেন। ২০২৪ সালে তিনি একটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধী হন। বর্তমানে তার বয়স ২৭ বছর এবং তিনি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এমন অবস্থায় মায়ের মৃত্যুর পর তিনি পেনশন পাবেন কি না, সেটিই তার মূল প্রশ্ন।
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলের মতামতে দেখা গেছে, কেউ কেউ মনে করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী সনদ থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করলে পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের মতে, পেনশনভোগী মায়ের জীবদ্দশায় প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অফিস ও হিসাবরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলে ভবিষ্যতে দাবির ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অনেকেই দাবি করেন, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিজীবী জীবিত থাকা অবস্থায় পরিবারের প্রতিবন্ধী সদস্যের তথ্য প্রদান করা প্রয়োজন হয়। ফলে পরবর্তীতে দুর্ঘটনাজনিত প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে পেনশনের উত্তরাধিকারী হওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রশাসনিক ও পেনশন সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, সাধারণ নিয়মে প্রাপ্তবয়স্ক ও কর্মক্ষম সন্তানরা ফ্যামিলি পেনশনের সুবিধা পান না। তবে স্থায়ীভাবে অক্ষম বা প্রতিবন্ধী এবং নিজের জীবিকা নির্বাহে অক্ষম সন্তানের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মেডিক্যাল বোর্ডের সনদ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে। যদি কোনো সরকারি কর্মচারী সন্তানের জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেন এবং পরবর্তীতে সেই সন্তান প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন, তাহলে তার অধিকার কী হবে? অনেকের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে আরও স্পষ্ট ও যুগোপযোগী বিধিমালা থাকা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত প্রতিবন্ধী নির্ভরশীলরা আইনি জটিলতায় না পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবন্ধী হওয়া এবং জীবিকা অর্জনে অক্ষম হওয়া এক বিষয় নয়। অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সফলভাবে ব্যবসা, চাকরি কিংবা গবেষণার মতো পেশায় যুক্ত আছেন। তাই শুধু প্রতিবন্ধী সনদ থাকলেই পেনশনের অধিকার নিশ্চিত হয় না; আবেদনকারীর আর্থিক নির্ভরশীলতা, কর্মক্ষমতা এবং সরকারি বিধিমালার শর্ত পূরণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ হলো, এ ধরনের ক্ষেত্রে অনুমান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতামতের ওপর নির্ভর না করে বাবার শেষ কর্মস্থল, সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং প্রয়োজন হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা উচিত। কারণ প্রতিটি আবেদন ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতার ধরন, চিকিৎসা সনদ, আর্থিক অবস্থা এবং প্রচলিত পেনশন বিধিমালার আলোকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
ফলে উল্লিখিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পেনশন পাওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে তার প্রতিবন্ধিতার সরকারি স্বীকৃতি, মেডিক্যাল বোর্ডের মতামত, আর্থিক নির্ভরশীলতার প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


