৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নতুন পে-স্কেল ২০২৬ : ১১–২০ গ্রেডে মাত্র ৩০০-৭০০ টাকার ব্যবধান, ক্ষোভে ফুঁসছেন কর্মচারীরা

সরকারি চাকরিতে দীর্ঘ ১১ বছর পর বহুল প্রতীক্ষিত ৯ম জাতীয় পে-স্কেল (২০২৬) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হলেও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে আনন্দের চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশার পাল্লাই ভারী হচ্ছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কিছুটা কমানোর দাবি করা হলেও, ভেতরের গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডের মূল বেতনের ব্যবধান মাত্র ৩০০, ৫০০ কিংবা ৭০০ টাকা রাখা হয়েছে, যা বর্তমান আকাশচুম্বী বাজারের প্রেক্ষাপটে চরম প্রহসন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্মচারীদের স্পষ্ট বক্তব্য—রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার এই সময়ে এমন বৈষম্যমূলক পে-স্কেল কোনোভাবেই কাম্য নয়। বৈষম্য দূর না হলে এই পে-স্কেল সাধারণ মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে, যা ধনীকে আরও ধনী এবং দরিদ্র কর্মচারীদের জাঁতাকলে পিষ্ট করবে।

একনজরে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো

খসড়া তথ্য ও প্রস্তাবিত বেতন স্কেল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে উন্নীত হওয়ার মূল বেতনের ব্যবধান অত্যন্ত সংকীর্ণ।

গ্রেড নম্বরপূর্ববর্তী মূল বেতন (২০১৫)নতুন প্রস্তাবিত মূল বেতন (২০২৬)পরবর্তী গ্রেডের সাথে ব্যবধান
গ্রেড ১১১২,৫০০ টাকা২৫,০০০ টাকা৭০০ টাকা (১২তম গ্রেড থেকে)
গ্রেড ১২১১,৩০০ টাকা২৪,৩০০ টাকা৩০০ টাকা
গ্রেড ১৩১১,০০০ টাকা২৪,০০০ টাকা৫০০ টাকা
গ্রেড ১৪১০,২০০ টাকা২৩,৫০০ টাকা৭০০ টাকা
গ্রেড ۱۵৯,৭০০ টাকা২২,৮০০ টাকা৯০০ টাকা
গ্রেড ১৬৯,৩০০ টাকা২১,৯০০ টাকা৫০০ টাকা
গ্রেড ১৭৯,০০০ টাকা২১,৪০০ টাকা৪০০ টাকা
গ্রেড ১৮৮,৮০০ টাকা২১,০০০ টাকা৫০০ টাকা
গ্রেড ১৯৮,৫০০ টাকা২০,৫০০ টাকা৫০০ টাকা
গ্রেড ২০৮,২৫০ টাকা২০,০০০০ টাকা

বিশ্লেষণ: টেবিলটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ১২তম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৩০০ টাকা। আবার ১৩ ও ১৪ গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৫০০ টাকা। একজন কর্মচারী বছরের পর বছর চাকরি করার পর বা পদোন্নতি পেয়ে যখন এক গ্রেড থেকে অন্য গ্রেডে যান, তখন যদি তার মূল বেতন মাত্র ৩০০ বা ৫০০ টাকা বাড়ে, তবে তা তার জীবনযাত্রায় কোনো ইতিবাচক প্রভাবই ফেলে না।

কর্মচারীদের ক্ষোভের প্রধান কারণসমূহ

  • প্রহসনের গ্রেড ব্যবধান: ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীরা বলছেন, ১ম গ্রেডের কর্মকর্তার বেতন যেখানে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে ২০তম গ্রেডে ২০,০০০ টাকা। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অনুপাত ১:৮ বলা হলেও, নিচের ১০টি গ্রেডের পারস্পরিক ব্যবধান এতটাই কম যে, পদোন্নতির কোনো বাস্তব সুফল কর্মচারীরা পাবেন না।

  • ২০টি গ্রেডের ঔপনিবেশিক কাঠামো: আন্দোলনরত কর্মচারী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল গ্রেড সংখ্যা ২০টি থেকে কমিয়ে ১২ বা ১৫টিতে নামিয়ে আনা। কিন্তু কমিশন সেই পুরনো ২০টি গ্রেডই বহাল রেখেছে, যাকে কর্মচারীরা “আমলাতান্ত্রিক স্বার্থরক্ষা” ও “দাসত্বের শৃঙ্খল” বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

  • বাজারদরের সাথে অসঙ্গতি: বর্তমান বাজারে চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়াসহ সবকিছুর দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে একজন নিম্ন-গ্রেডের কর্মচারী সর্বসাকুল্যে যে টাকা পাবেন, তা দিয়ে মাস চালানো অসম্ভব। ফলে মাস শেষে তাদের “হাতে হারিকেন” নিয়ে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না।

বৈষম্য না কমলে এটি হবে ‘জাতির জন্য অভিশাপ’

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতাদের মতে, পে-স্কেলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিম্নআয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। কিন্তু এই প্রস্তাবনায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেভাবে বিপুল অংকের সুবিধা পাচ্ছেন, সেই তুলনায় নিম্ন ধাপে কেবল টিকে থাকার মতো কিছু টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে সমাজে এবং সরকারি কাঠামোতে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে। ধনী ও গরিবের ব্যবধান কমানোর পরিবর্তে এই পে-স্কেল জাঁতাকলে পিষ্ট করবে নিম্নবিত্তদের।

কর্মচারীদের আলটিমেটাম:

গ্রেড বৈষম্য দূর করে বেতন কাঠামো সম্পূর্ণ বৈষম্যমুক্ত না করা হলে এই পে-স্কেল তারা মেনে নেবেন না। অবিলম্বে গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে আনা, ১১-২০ গ্রেডের ব্যবধান সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং ইনক্রিমেন্টের হার বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ১১-২০ গ্রেড সরকারি চাকুরিজীবী ফোরামের নেতৃবৃন্দ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *