অবিবাহিত ও পরিবারহীন নারী চাকরিজীবীর মৃত্যুতে পেনশন প্রাপ্যতা: বিধিমালা যা বলে
কোনো অবিবাহিত নারী সরকারি চাকরিজীবী যদি চাকুরিরত অবস্থায় বা অবসর গ্রহণের পর মৃত্যুবরণ করেন এবং তার বাবা-মা, ভাই-বোন বা সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি উত্তরাধিকারী না থাকে, তবে তার অর্জিত আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) এবং পেনশন কে পাবেন—তা নিয়ে সরকারি বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পেনশন বিধিমালা এবং “সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০”-এর আলোকপাত করে বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।
১. পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০ অনুযায়ী ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা
বিধিমালা অনুযায়ী, পারিবারিক পেনশন বা আনুতোষিক পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো সুবিধাভোগীকে অবশ্যই মৃত কর্মচারীর ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞায়িত সদস্য হতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিধি অনুযায়ী, আনুতোষিক ও পেনশনের জন্য পরিবারের সদস্যদের অগ্রাধিকারের একটি ক্রম রয়েছে:
প্রথম ধাপে: স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তান (২৫ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্র, অবিবাহিত/বিধবা/তালাকপ্রাপ্ত কন্যা অথবা প্রতিবন্ধী সন্তান)।
দ্বিতীয় ধাপে: ওপরের কেউ না থাকলে ২৫ বছরের অধিক বয়সী পুত্র এবং বিবাহিত কন্যা।
তৃতীয় ধাপে: প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের কেউ না থাকলে মৃত কর্মচারীর বাবা, মা, ১৮ বছরের কম বয়সী ভাই, অবিবাহিত বোন এবং বিধবা বোন।
২. রক্তের কোনো আত্মীয় না থাকলে কি নমিনি টাকা পাবেন?
অনেকেরই ধারণা, ফর্মে যাকে ‘নমিনি’ বা মনোনীত ব্যক্তি করা হবে, তিনি সম্পর্কের বাইরে হলেও সব টাকা পাবেন। কিন্তু সরকারি পেনশন বিধির ৩.০১ অনুচ্ছেদ এবং অর্থ বিভাগের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী:
পেনশন ও আনুতোষিকের ক্ষেত্রে নমিনি বা মনোনীত ব্যক্তি অবশ্যই বিধিমালা নির্দেশিত ‘পরিবারের সদস্য’ বা রক্তের সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট আত্মীয়দের মধ্য থেকে হতে হবে। পরিবারের সংজ্ঞার বাইরে কোনো দূরবর্তী আত্মীয় (যেমন: চাচা, ফুফু, মামা, খালা) কিংবা কোনো বহিরাগত বা বেকার ব্যক্তিকে নমিনি করা হলেও, সরকার তাকে পেনশন বা আনুতোষিক দিতে বাধ্য নয়। আইনগতভাবে তারা এই অর্থ পাবেন না।
যদি তৃতীয় ধাপে উল্লিখিত আত্মীয়দের (বাবা-মা, ভাই-বোন) কেউই জীবিত না থাকেন, তবে বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী দূরবর্তী কোনো আত্মীয়ের অনুকূলে এই টাকা দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ আর থাকে না।
৩. কেউ না থাকলে পেনশনের টাকা কি তামাদি হয়ে যাবে?
হ্যাঁ, অর্থ বিভাগের ১৬/০৪/১৯৫৯ তারিখের চিঠির মূল স্পিরিট এবং পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০-এর ৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী—যদি কোনো সরকারি কর্মচারীর মৃত্যুর পর বিধিমালা অনুযায়ী যোগ্য কোনো ‘পারিবারিক সদস্য’ বা নির্দিষ্ট রক্তের আত্মীয় খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে উক্ত আনুতোষিক ও পেনশন সম্পূর্ণ সরকারি কোষাগারে থেকে যাবে। এটি অন্য কোনো ব্যক্তির অনুকূলে পরিশোধ করা হবে না এবং আইনি পরিভাষায় তা রাষ্ট্রের অনুকূলে ‘তামাদি’ হয়ে যাবে।
৪. প্রচলিত সামাজিক আলোচনা ও বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সাধারণ আলোচনায় অনেকে মন্তব্য করে থাকেন যে, “টাকা রাষ্ট্রের কাছে থেকে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার হবে” কিংবা রসাত্মক ছলে বলা হয় “পেনশন নিশ্চিত করতে অন্তত একজন বেকার ছেলেকে বিয়ে করা উচিত।”
বাস্তবতার নিরিখে, একজন স্বাবলম্বী চাকরিজীবী নারী কাকে বিয়ে করবেন বা করবেন না, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা এটিই স্পষ্ট করে যে—বিবাহিত হলে তার স্বামী বা সন্তানরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেনশনের অধিকারী হন। কিন্তু অবিবাহিত এবং সম্পূর্ণ পরিবারহীন থাকার ক্ষেত্রে, চাকুরিজীবীর মৃত্যুর পর তার অর্জিত এই দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সুবিধা ভোগ করার মতো কোনো আইনি উত্তরাধিকারী অবশিষ্ট থাকে না।
সংক্ষেপে মূল বিষয়:
নমিনির সীমাবদ্ধতা: পরিবারের সংজ্ঞার বাইরে কাউকে নমিনি করলেও তিনি পেনশন পাবেন না।
আইনের ধারা: ‘সরকারি কর্মচারীগণের পেনশন সহজীকরণ আদেশ, ২০২০’ অনুযায়ী যোগ্য কোনো পারিবারিক সদস্য না থাকলে আনুতোষিক বা পেনশন অন্য কাউকে দেওয়া সম্ভব নয়।
চূড়ান্ত পরিণতি: উত্তরাধিকারীর অভাবে উক্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে অবমুক্ত বা তামাদি হয়ে যাবে।



