সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সামরিক চাকরি থেকে ‘আনঅফিশিয়াল’ বিদায় ও নতুন চাকরি : iBAS++ জটিলতা ও আইনি পরিণতি কি?

চাকরি পরিবর্তন বা ভালো সুযোগের আশায় অনেকেই এক কর্মস্থল ছেড়ে অন্য কর্মস্থলে যোগদান করেন। তবে সাধারণ সিভিল চাকরির চেয়ে সামরিক বাহিনীর (সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী) নিয়মকানুন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত কঠোর। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বা অফিশিয়াল পদত্যাগ (Resignation) না দিয়ে সামরিক বাহিনী থেকে ৭-৯ মাস ধরে অনুপস্থিত থাকা বা ‘আনঅফিশিয়ালি’ চলে আসার পর নতুন কোনো সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে iBAS++ (Integrated Budget and Accounting System) সংক্রান্ত চরম জটিলতা এবং আইনি ঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে এই সংক্রান্ত ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে একটি ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।

১. সামরিক বাহিনীতে অনুপস্থিতি: এটি কি শুধুই চাকরি ছেড়ে দেওয়া, নাকি অপরাধ?

The Army Act, 1952 (বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর আইন) অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা ছুটি ছাড়া দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকাকে ‘সেচ্ছায় পলায়ন’ বা ‘ডিজারশন’ (Desertion) হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: সামরিক বাহিনী থেকে এভাবে চলে আসলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাহিনীর পক্ষ থেকে সাধারণত থানায় মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারে।

  • কোর্ট মার্শাল ও জেল: ইউনিফর্মধারী সদস্যদের ক্ষেত্রে এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে কোর্ট মার্শাল (Court Martial) হওয়া এবং অপরাধের মাত্রাভেদে ৬ থেকে ১২ মাসের সিভিল জেল বা কারাদণ্ড হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

২. নতুন চাকরিতে iBAS++ কেন বন্ধ বা চালু হচ্ছে না?

বর্তমানে বাংলাদেশের সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও ভাতা iBAS++ সফটওয়্যার বা জাতীয় ডাটাবেজের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়।

  • যেহেতু আগের চাকরি থেকে অফিশিয়ালি রিলিজ বা পদত্যাগ মঞ্জুর হয়নি, তাই iBAS++ সিস্টেমে ওই ব্যক্তির আইডি এখনও পূর্বের কর্মস্থলেই ‘Active’ বা সচল রয়েছে।

  • একটি এনআইডি (NID) দিয়ে iBAS++ এ দুটি আইডি সচল করা বা নতুন করে এন্ট্রি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, নতুন চাকরিতে যোগদান করলেও ভুক্তভোগী কোনো বেতন তুলতে পারবেন না।

৩. সিভিল বনাম ইউনিফর্মধারী: জটিলতার পার্থক্য

সামরিক বাহিনীতে দুই ধরনের জনবল থাকে—সৈনিক/অফিসার (ইউনিফর্মধারী) এবং বেসামরিক (সিভিলিয়ান) স্টাফ।

  • সিভিলিয়ান হলে: তারা তুলনামূলক কম জটিলতায় পড়েন। তারা পূর্বের অফিস থেকে অব্যাহতি (Resignation) নিয়ে এবং বকেয়া/দেনা-পাওনা পরিশোধ করে ছাড়পত্র নিলে এসএফসি (SFC) বা অ্যাকাউন্টস অফিস থেকে iBAS++ আইডি বাতিল বা স্থানান্তর করতে পারেন।

  • ইউনিফর্মধারী (সৈনিক) হলে: এদের ক্ষেত্রে নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। সদরদপ্তর এবং সিজিডিএফ (CGDF) কার্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই আইবাস ডাটাবেজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

৪. এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় বা করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞ এবং ভুক্তভোগীদের পরামর্শ অনুযায়ী, এই ধরনের জটিলতায় পড়লে লুকিয়ে না থেকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করাই একমাত্র পথ:

  • ইউনিট/সংস্থায় যোগাযোগ ও আত্মসমর্পণ: প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পূর্বের ইউনিট বা গ্যারিসনে যোগাযোগ করতে হবে। পারিবারিক জরুরি অবস্থা বা উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে কমান্ডিং অফিসারকে (CO) বুঝিয়ে বলতে হবে।

  • কোর্ট মার্শাল ও দণ্ড ভোগ: পলাতক থাকার কারণে সামরিক নিয়ম অনুযায়ী কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হতে হবে। কর্তৃপক্ষ যদি সদয় হয় বা লঘুদণ্ড (যেমন তিরস্কার বা স্বল্পমেয়াদি সাজা) দেয়, তবেই কেবল চাকরি থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি বা বরখাস্তের আদেশ মিলবে।

  • দেনা-পাওনা বা সরকারি টাকা ফেরত: পলাতক থাকা অবস্থায় যদি কোনো বেতন বা ভাতা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা আইবাসের মাধ্যমে চলে আসে, তবে সেই মূল টাকা (Basic) সরকারি কোষাগারে সরকারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।

  • পদত্যাগপত্র ও রিলিজ অর্ডার ফরওয়ার্ড: ইউনিট থেকে পদত্যাগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সদরদপ্তরে এবং সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে FC (Army) Pay-2 বা CGDF কার্যালয়ে পাঠাতে হবে। সেখান থেকে অনুমতি পেলেই কেবল আইবাসের হেড অফিস (IEB) বা উপজেলা/জেলা অ্যাকাউন্টস অফিস থেকে আগের আইডি বাতিল করা যাবে।

  • সময়সীমা: পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। আইবাসের ব্যাকএন্ডে গিয়ে তথ্য পরিবর্তন বা আগের এন্ট্রি মুছে নতুন করে এন্ট্রি দিতে আনুমানিক ৩ থেকে ৪ মাস বা তারও বেশি সময় ধরে নিয়মিত দাপ্তরিক দৌড়ঝাঁপ করতে হতে পারে।

সতর্কবার্তা: সরকারি চাকরিতে প্রবেশের যেমন নির্দিষ্ট বিধিমালা রয়েছে, তেমনি চাকরি ছাড়ারও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পূর্বের চাকরির অফিশিয়ালি গৃহীত রিজাইন লেটার বা রিলিজ অর্ডার ছাড়া কোনো মতেই নতুন চাকরিতে বেতন চালু করা বা পেনশনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সাময়িক ভোগান্তি এড়াতে ‘আনঅফিশিয়ালি’ কর্মস্থল ত্যাগ না করে সর্বদা অফিশিয়াল প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *