বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

দপ্তরী কাম প্রহরীকে ২৪ ঘণ্টা/৩৬৫ দিন ডিউটি করানো কতটা আইনসম্মত? সরকারি নথি ও আদালতের নথি যা বলছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরীদের দায়িত্ব পালনের সময় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে তাঁদের ২৪ ঘণ্টা বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দপ্তরী কাম প্রহরীর নিয়োগের শর্তে কি সত্যিই ২৪ ঘণ্টা বা বছরের ৩৬৫ দিন দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে?

বিষয়টি যাচাই করতে পাওয়া সরকারি নীতিমালা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন নথি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত কার্যতালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবির মতো সরল নয়। বরং দায়িত্বের সময় নির্ধারণে নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশ—সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

দপ্তরী কাম প্রহরী আসলে কোন ধরনের পদ?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম প্রহরী পদটি সাধারণ রাজস্বখাতের স্থায়ী সরকারি পদ হিসেবে নয়, বরং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। সরকারি তথ্যভান্ডারে এ পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের নীতিমালা সংশোধনের নথি সংরক্ষিত রয়েছে।

এ কারণে দায়িত্ব, সেবার সময়, পারিশ্রমিক ও অন্যান্য শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

২০২২ সালের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি নির্দেশনার বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যেও বলা হয়েছে, দপ্তরী কাম প্রহরী পদটি আউটসোর্সিং পদ এবং তাঁদের সেবামূল্য চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

২৪ ঘণ্টা ডিউটির দাবি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

অনেক দপ্তরী কাম প্রহরীর অভিযোগ—তাঁদের বলা হয়, বিদ্যালয়ে রাতের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকায় তাঁকে দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যালয়ে অবস্থান করতে হবে। অর্থাৎ কার্যত ২৪ ঘণ্টা এবং বছরের সব দিন বিদ্যালয়ে থাকার চাপ তৈরি হয়।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

“প্রহরীর দায়িত্ব আছে”—এ কথা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “২৪ ঘণ্টা অবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যালয়ে থাকতে হবে”—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না।

কত ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হবে, কখন বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে হবে এবং রাতের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে লিখিত নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা দেখতে হবে।

২০১২ সালের নীতিমালার বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দপ্তরী-কাম-প্রহরী নিয়োগের পুরোনো নীতিমালায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নীতিমালায় সংশোধনও হয়েছে। সরকারি তথ্যভান্ডারেও ২০১৫ সালের সংশোধিত নীতিমালার উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু ২০১২ সালের কোনো একটি নথি দেখেই বর্তমান দায়িত্বের সব শর্ত নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। পরবর্তী সংশোধিত নীতিমালা ও বর্তমান চুক্তির শর্তও দেখতে হবে।

২০১৯ ও ২০২২ সালের নির্দেশনা থেকে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২২ সালের নির্দেশনা সম্পর্কিত প্রকাশিত নথিতে বলা হয়েছে, দপ্তরী কাম প্রহরীদের সেবামূল্য প্রকৃত সেবা প্রদানের দিন ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিবেচিত হবে। অর্থাৎ তাঁদের কাজের সম্পর্কটি চুক্তিভিত্তিক সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজের সময় ও দায়িত্বের ধরন নির্ধারণে মৌখিক নির্দেশের চেয়ে লিখিত চুক্তির শর্তের গুরুত্ব বেশি।

হাইকোর্টের ১৭০৮৩/২০১৭ রিট নিয়ে কী জানা গেল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত দাবিতে রিট পিটিশন নং ১৭০৮৩/২০১৭-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এ মামলায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নাকি লিখিতভাবে জানিয়েছিল যে দপ্তরী কাম প্রহরীর ডিউটি ২৪ ঘণ্টা নয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত কার্যতালিকায় Writ Petition No. 17083/2017-এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়। সেখানে মামলাটি Sadan Chandra Barua vs Bangladesh and others নামে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উন্মুক্তভাবে পাওয়া কার্যতালিকা থেকে মামলার পূর্ণাঙ্গ রিট পিটিশন, সরকারের লিখিত জবাব বা চূড়ান্ত রায়ের সেই অংশ যাচাই করা যায়নি যেখানে সরাসরি বলা হয়েছে, “দপ্তরী কাম প্রহরীর ডিউটি ২৪ ঘণ্টা নয়, শুধু স্কুল সময়।”

তাই সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবিকে চূড়ান্ত আদালতের সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যতক্ষণ না মামলার পূর্ণাঙ্গ আদেশ/রুল বা সংশ্লিষ্ট সরকারি হলফনামার কপি হাতে পাওয়া যায়।

তাহলে কি ২৪ ঘণ্টা ডিউটি সম্পূর্ণ বেআইনি?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।

শুধু পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে “সব ক্ষেত্রেই ২৪ ঘণ্টা ডিউটি সম্পূর্ণ বেআইনি”—এমন সর্বজনীন ঘোষণা দেওয়া নিরাপদ নয়।

কারণ কোনো কর্মীর দায়িত্বের সময় নির্ধারণে তাঁর—

  • নিয়োগপত্র;
  • চুক্তিপত্র;
  • সংশ্লিষ্ট সময়ের কার্যকর নীতিমালা;
  • বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশ;
  • প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রযোজ্য পরিপত্র;
  • এবং প্রয়োজন হলে আদালতের আদেশ

—এসব বিবেচনা করতে হবে।

তবে একইভাবে নিয়োগপত্র বা চুক্তিতে স্পষ্ট ভিত্তি ছাড়া শুধু মৌখিকভাবে কাউকে ২৪ ঘণ্টা/৩৬৫ দিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এমন দাবিও প্রশ্নের বাইরে নয়।

সরকারি ছুটির ক্ষেত্রেও চুক্তির শর্ত দেখতে হবে

দপ্তরী কাম প্রহরীদের ছুটি ও সেবার শর্ত নিয়েও বিভিন্ন নীতিমালার কথা বলা হয়। কিন্তু এখানে ২০০৮ সালের পুরোনো আউটসোর্সিং নীতিমালা এবং পরবর্তী ২০১২, ২০১৫, ২০১৮/২০১৯ ও ২০২২ সালের সংশোধিত বা প্রযোজ্য নথির মধ্যে কোনটি সংশ্লিষ্ট কর্মীর ক্ষেত্রে কার্যকর—তা আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

কারণ আউটসোর্সিং ব্যবস্থার নীতিমালা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২২ সালের নির্দেশনাতেও ২০১৮ সালের আউটসোর্সিং নীতিমালা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নীতিমালার আলোকে দপ্তরী কাম প্রহরীদের সেবামূল্য প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী হলে কী করবেন?

কোনো দপ্তরী কাম প্রহরী যদি মনে করেন তাঁকে চুক্তি বা প্রযোজ্য নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত সময় দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা হচ্ছে, তাহলে উত্তেজিত হয়ে দায়িত্বে অনুপস্থিত না থেকে প্রথমে লিখিত প্রমাণ তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১. নিয়োগপত্র/চুক্তিপত্রের কপি সংগ্রহ করুন।

২. দায়িত্ব পালনের সময় সম্পর্কে প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত নির্দেশ চাইতে পারেন।

৩. মৌখিকভাবে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হলে সম্ভব হলে লিখিত আদেশ চেয়ে আবেদন করুন।

৪. বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের সময়ের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড সংরক্ষণ করুন।

৫. সমস্যা সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিস এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন।

৬. অভিযোগের সঙ্গে নিয়োগপত্র, চুক্তিপত্র, লিখিত নির্দেশ এবং দায়িত্ব পালনের প্রমাণ সংযুক্ত করুন।

৭. গুরুতর বিরোধ হলে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও নথি নিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

দপ্তরী কাম প্রহরীর নামের মধ্যে “প্রহরী” শব্দটি থাকলেও শুধু এই শব্দের ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টা এবং ৩৬৫ দিন অবিচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না। আবার অন্যদিকে, কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে বলেই সব ধরনের অতিরিক্ত দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেআইনি—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।

প্রকৃত অধিকার নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হলো নিজের নিয়োগপত্র/চুক্তিপত্র এবং বর্তমানে কার্যকর সরকারি নীতিমালা ও লিখিত নির্দেশনা।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া “২৪ ঘণ্টা ডিউটি সম্পূর্ণ বেআইনি”—এই বক্তব্যটি সরাসরি অনুসরণ না করে প্রত্যেক দপ্তরী কাম প্রহরীর উচিত নিজের নিয়োগের সময়কার ও বর্তমানে কার্যকর নথি যাচাই করা।

একই সঙ্গে, যদি কোনো কর্তৃপক্ষ লিখিত বিধান বা চুক্তির বাইরে ২৪ ঘণ্টা/৩৬৫ দিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি লিখিতভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সুতরাং অধিকার রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো—মৌখিক কথার পরিবর্তে সরকারি কাগজ, লিখিত আদেশ ও চুক্তির শর্ত।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *