৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেল: ২০ হাজার টাকা কমিয়ে ১৬ হাজার ৫০০ হলে অভাব থেকেই যাবে, বলছেন কর্মচারীরা

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা রাখার বিষয়টি সামনে এলেও তা কমিয়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করার আলোচনা কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা বলছেন, ২০ হাজার টাকার সুপারিশও যদি কাটছাঁট করে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়, তাহলে দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরও নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক সংকট কাটবে না।

২০ হাজার থেকে ১৬ হাজার ৫০০—কেন এত আলোচনা?

বর্তমানে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। এই বেতনের ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করলে তা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সচিব কমিটির আলোচনায় নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এমন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টি এসেছে। কিন্তু জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সংগঠনগুলো জানিয়েছে।

অর্থাৎ, ২০ হাজার টাকার পরিবর্তে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হলে একজন কর্মচারী মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা কম মূল বেতন পাবেন। বছরে মূল বেতনের হিসাবে এই ব্যবধান দাঁড়াবে ৪২ হাজার টাকা। দীর্ঘমেয়াদে এই পার্থক্য শুধু মাসিক আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মূল বেতনের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা, ভবিষ্যৎ বেতন বৃদ্ধি এবং অবসর-সংশ্লিষ্ট হিসাবেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

কর্মচারীদের দাবি ৩৫ হাজার টাকা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেকের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মচারীরা জাতীয় বেতন কমিশনের কাছে সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, গত ১১ বছরে দুটি পে-স্কেল না হওয়ায় আগের বেতন কাঠামোর সঙ্গে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

অষ্টম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৪ হাজার ১০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ৮ হাজার ২৫০ টাকা করা হয়েছিল। কর্মচারী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে আরেকটি পে-স্কেল হলে সেই বেতন আরও বাড়ার সুযোগ ছিল। ফলে বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় তারা ৩৫ হাজার টাকা দাবি করেন। তবে কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা রাখার কথা বলা হয়েছে—যা তাদের দাবির তুলনায় ১৫ হাজার টাকা কম।

২০ হাজার টাকাও কেন অপর্যাপ্ত মনে করা হচ্ছে?

এখানেই মূল প্রশ্নটি হলো—১৬ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে একজন নিম্নগ্রেডের সরকারি কর্মচারী বর্তমান সময়ে কতটা স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারবেন?

কর্মচারী সংগঠনের নেতাদের যুক্তি, শুধু খাবারের ব্যয় হিসাব করলেও নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক চাপ স্পষ্ট হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি ভাত, ডাল ও আলুভর্তার মতো সাধারণ খাবার খেলেও তিন বেলায় দৈনিক প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হতে পারে। সে হিসাবে শুধু খাবারের পেছনেই মাসে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হতে পারে।

এর সঙ্গে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, যাতায়াত, পোশাক, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের খরচ এবং সামাজিক ও জরুরি ব্যয় যুক্ত হলে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল বেতন কতটা পর্যাপ্ত—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

৮ হাজার ২৫০ থেকে ১৬ হাজার ৫০০—শতভাগ বৃদ্ধি হলেও বাস্তবে কতটা লাভ?

কাগজে-কলমে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হলে বেতন দ্বিগুণ হয়। কিন্তু বেতন দ্বিগুণ হওয়া আর ক্রয়ক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়া এক বিষয় নয়।

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হলো। কাগজে তার আয় ৮ হাজার ২৫০ টাকা বাড়ছে। কিন্তু একই সময়ে যদি খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে অতিরিক্ত ৮ হাজার ২৫০ টাকার প্রকৃত মূল্য অনেকটাই কমে যায়।

এ কারণেই কর্মচারী সংগঠনগুলো শুধু শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধি না দেখে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে বেতন নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে।

২০ হাজার টাকার সুপারিশ কাটছাঁট হলে বৈষম্যের অভিযোগ কেন উঠছে?

কর্মচারীদের অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেতন কাঠামোর অনুপাত। কল্যাণ সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে ১:৪ অনুপাতের কাঠামো চেয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সুপারিশে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত করার কথা এসেছে।

অন্যদিকে সর্বনিম্ন বেতন যদি ২০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়, তাহলে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ওপর চাপ আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কা তাদের।

অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু ‘২০ হাজার বনাম ১৬ হাজার ৫০০’ নয়; এর সঙ্গে জড়িত বেতন বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা

২০তম গ্রেডের বেতনে কী পরিবর্তন হতে পারে?

প্রকাশিত পে-স্কেল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের বর্তমান মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। কমিশনের আলোচনায় সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা ধরা হলে বৃদ্ধি হবে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১৪২ শতাংশ। বিপরীতে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হলে বৃদ্ধি হবে ৮ হাজার ২৫০ টাকা, অর্থাৎ ঠিক ১০০ শতাংশ।

বিষয়বর্তমান২০ হাজার হলে১৬,৫০০ হলেসর্বনিম্ন মূল বেতন৮,২৫০ টাকা২০,০০০ টাকা১৬,৫০০ টাকাবর্তমানের তুলনায় বৃদ্ধি—১১,৭৫০ টাকা৮,২৫০ টাকাবৃদ্ধির হার—প্রায় ১৪২%১০০%২০ হাজারের তুলনায় পার্থক্য——৩,৫০০ টাকা

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১৬ হাজার ৫০০ টাকা কোনো অতিরিক্ত নতুন সংখ্যা নয়; এটি ৮ হাজার ২৫০ টাকার ওপর ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির সরল ফল। আর ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলে তা বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় আরও বেশি বৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।

তবে ২০ হাজার টাকার সুপারিশও এখনো চূড়ান্ত নয়

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জাতীয় বেতন কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশের তথ্য আলাদাভাবে এসেছে। তাই ১৬ হাজার ৫০০ টাকা বা ২০ হাজার টাকা—কোনোটিকেই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত কার্যকর বেতন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

১৫ আগস্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, সচিব কমিটির সুপারিশে নিম্নগ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি এলে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হয়। সংগঠনটি এই মাত্রার বৃদ্ধি প্রত্যাখ্যান করে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বহাল রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে তা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।

সামনে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সামনে একদিকে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি, অন্যদিকে রয়েছে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বেতন কাঠামোর অনুপাত, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন এবং বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়।

এর আগেও পে-স্কেলের আর্থিক হিসাব, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা কাঠামো সমন্বয় নিয়ে সচিব কমিটির জটিলতার কথা প্রকাশিত হয়েছে।

তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সরকারকে শুধু মোট ব্যয়ের হিসাব করলেই হবে না; নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

শেষ কথা

নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হলে সেটি বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকার ওপর শতভাগ বৃদ্ধি হিসেবে দেখানো সম্ভব। কিন্তু কর্মচারীদের প্রশ্ন হলো—শতভাগ বেতন বাড়লেই কি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে?

কর্মচারী সংগঠনগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১১ বছর পর পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় যদি সর্বনিম্ন বেতন আবার পুরোনো বেতনের দ্বিগুণের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে বাজারদরের চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। তাদের দাবি, ২০ হাজার টাকা কমানো তো নয়ই, বরং বর্তমান বাজারমূল্য ও পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সর্বনিম্ন বেতন আরও বাড়ানো উচিত।

অতএব, নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা নাকি ২০ হাজার টাকা—এই পার্থক্যটি শুধু ৩ হাজার ৫০০ টাকার নয়; এটি নিম্নগ্রেডের লাখো কর্মচারীর মাসিক আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখন তাদের দৃষ্টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপনের দিকে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *