নতুন পে-স্কেলে বাড়তি খরচ ১.০৬ লাখ কোটি টাকা: অর্থের উৎস, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বড় প্রশ্ন
১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বাড়ছে, তেমনি সামনে আসছে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও। প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য এই বেতন বৃদ্ধির ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
একদিকে দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। অন্যদিকে দেশের রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি, ব্যাংকিং খাত, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের বর্তমান পরিস্থিতিতে এত বড় অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি গ্লোবাল টেলিভিশন নিউজের নিয়মিত টকশো ‘প্রশ্নগুলো সহজ’ অনুষ্ঠানে পে-স্কেলের অর্থায়ন, কর ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান বদির রহমান এবং শিক্ষক ও বিএনপি নেতা মোশারফ ঠাকুর। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আবহেনা রাজ্জাকী।
১১ বছর পর নতুন বেতন কাঠামোর উদ্যোগ
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ ১১ বছর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে বর্তমান বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে।
আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে সচিবদের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এটি এখনো চূড়ান্ত বাস্তবায়িত বেতন কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের কমিটি পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করছে। অর্থাৎ প্রস্তাবিত অঙ্ক, ধাপ ও সুবিধার ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
একবারে নয়, তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর সম্ভাব্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন। একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করলে সরকারের ওপর যে বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হবে, সেটি সামাল দিতে তিন ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—
প্রথম বছরে: মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
দ্বিতীয় বছরে: মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
তৃতীয় বছরে: অন্যান্য ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধাগুলো ধাপে ধাপে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
এভাবে বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের এক বছরের ওপর পুরো আর্থিক চাপ একসঙ্গে পড়বে না। বাজেট ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সংগ্রহ এবং মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার পর্যায়ক্রমে ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ পাবে।
১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা আসবে কোথা থেকে?
পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থের উৎস নিয়ে। আলোচনায় বলা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এটি কোনো ছোট অঙ্ক নয়। এই অর্থের সংস্থান করতে সরকারকে একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয় ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প অর্থায়নের পথ বিবেচনা করতে হবে।
এখানেই অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে মূল বিতর্ক—সরকার কি ব্যাংকঋণ নেবে, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করবে, নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ বাড়িয়ে এই অর্থের বড় অংশ জোগাড় করবে?
করের আওতা বাড়ানোই হতে পারে টেকসই সমাধান
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তাদের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—দেশে করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনো কার্যকরভাবে করের আওতার বাইরে রয়েছে।
বিশেষ করে শহরের উচ্চবিত্ত এলাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুল সম্পদ ও আয় থাকা অনেক ব্যক্তি যথাযথভাবে করের আওতায় আসছেন না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এই পরিস্থিতিতে করের হার শুধু বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা এবং করের আওতা বাড়ানো বেশি কার্যকর হতে পারে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেলের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ না দিয়ে সরকার যদি কর ফাঁকি বন্ধ করে, অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদের ওপর নজরদারি বাড়ায় এবং নতুন করদাতা তৈরি করতে পারে, তাহলে রাজস্ব সংগ্রহের বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বিপদ কোথায়?
সরকারের হাতে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া একটি সম্ভাব্য পথ। কিন্তু এরও বড় ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার একটি বড় অংশ সরকারি অর্থায়নে চলে যেতে পারে। এর ফলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
বিশেষ করে শিল্প, ব্যবসা ও নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ যদি কমে যায় বা সুদের হার বেড়ে যায়, তাহলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
অর্থাৎ পে-স্কেলের অর্থ জোগাতে গিয়ে যদি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যায়, তাহলে একদিকে সরকারি কর্মচারীরা বাড়তি আয় পাবেন, অন্যদিকে অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশ চাপের মুখে পড়তে পারে।
টাকা বাড়লে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি কতটা?
নতুন পে-স্কেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঝুঁকিগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি।
সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত টাকা গেলে তাদের ভোগক্ষমতা বাড়বে। তারা বেশি পণ্য ও সেবা কিনতে পারবেন। এতে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে।
কিন্তু একই সময়ে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তাহলে চাহিদার চাপ থেকে দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এর প্রভাব শুধু সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, পোশাক, বাসাভাড়া, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে বেসরকারি চাকরিজীবী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন।
এ কারণেই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে বাজার সরবরাহ, উৎপাদন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
তবে বাজারে অর্থপ্রবাহের ইতিবাচক দিকও রয়েছে
অর্থনীতির অন্য একটি দিকও এখানে বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ব্যয়ও বাড়বে। এই বাড়তি ব্যয় দোকানদার, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, সেবা খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে পারে।
ফলে শুধু মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নয়, অর্থনীতিতে চাহিদা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
বাড়তি চাহিদা যদি দেশের উৎপাদন বাড়ায়, তাহলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। কিন্তু চাহিদা বাড়লেও যদি উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থ শেষ পর্যন্ত পণ্যমূল্য বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হতে পারে।
সুতরাং মূল বিষয় শুধু কত টাকা বাজারে ঢুকছে তা নয়; বরং টাকার বিপরীতে কত পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হচ্ছে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২৩ লাখের বেশি পরিবার বনাম বৃহত্তর জনগোষ্ঠী
আলোচনায় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় ২৩ লাখের বেশি পরিবারের কথা উঠে এসেছে। তাদের জন্য পে-স্কেল নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়।
কিন্তু বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরাসরি সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় নেই। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি পরিবারের আয় বাড়লেও এর বিপরীতে বাজারদর বাড়লে সেই চাপ বহন করতে হবে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেই।
এখানেই সরকারের নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হবে—কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কীভাবে রক্ষা করা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু বেতন বাড়ানোকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো অর্থনৈতিক চিত্রটি পাওয়া যাবে না।
মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে ‘দ্বিমুখী’ নীতি প্রয়োজন
পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে হবে।
এ জন্য তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—
১. রাজস্ব আয় বাড়ানো: করের আওতা বাড়িয়ে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা।
২. উৎপাদন বাড়ানো: বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য, শিল্পপণ্য ও সেবার উৎপাদন বাড়ানো।
৩. বাজার মনিটরিং: কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
এই তিনটি জায়গায় ব্যর্থতা হলে পে-স্কেলের সুফল আংশিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে হারিয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতিও পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ শিল্প ও ব্যবসা খাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহ কমবে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে চাহিদা বাড়বে। এই দুইয়ের সমন্বয়হীনতা মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে পোশাক ও টেক্সটাইলসহ উৎপাদনশীল খাত দুর্বল হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়েও চাপ পড়তে পারে।
আলোচনায় গত কয়েক মাসে প্রায় ৯০০ টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে। এসব তথ্য সঠিক ও চূড়ান্তভাবে যাচাইযোগ্য হলে তা অর্থনীতির জন্য বড় সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হবে।
পে-স্কেল কি তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়াবেই?
এ প্রশ্নের সরল উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।
পে-স্কেলের কারণে যদি বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূর্ণভাবে নতুন ঋণ বা অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে মেটানো হয়, অথচ উৎপাদন না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ঝুঁকি অবশ্যই থাকবে।
অন্যদিকে সরকার যদি ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়ন করে, রাজস্ব আয় বাড়ায়, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমায়, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ায় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করে, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অর্থাৎ পে-স্কেল নিজে মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ নয়; এর অর্থায়ন পদ্ধতি এবং একই সময়ে সরকারের অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতি মূল্যস্ফীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
সবচেয়ে বড় সুযোগ কর সংস্কারে
নতুন পে-স্কেলকে শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রকল্প হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের করব্যবস্থা সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
দেশের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতাকে করের আওতায় আনা, আয় ও সম্পদের তথ্যের ডিজিটাল সমন্বয়, কর ফাঁকি কমানো এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো গেলে সরকারের নিয়মিত রাজস্ব আয় বাড়তে পারে।
তখন পে-স্কেলের জন্য আলাদা করে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কমবে।
আর ঋণনির্ভরতা কমলে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন কেন গুরুত্বপূর্ণ
প্রস্তাবিত তিন ধাপের বাস্তবায়ন কৌশল অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ একবারে পুরো ব্যয় কার্যকর না করে সময় নিয়ে বাস্তবায়ন করলে সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যয়কে সামঞ্জস্য করতে পারবে।
প্রথম বছরে মূল বেতনের একটি অংশ বাস্তবায়ন করে রাজস্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় ধাপে পরবর্তী অংশ যুক্ত করার আগে মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, কর আদায় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
তৃতীয় ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করার আগে সরকারের হাতে আরও পরিষ্কার অর্থনৈতিক চিত্র থাকবে।
এই পদ্ধতি কার্যকর হলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের ধাক্কা একবারে অর্থনীতির ওপর পড়বে না।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তি, সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা
নতুন পে-স্কেল সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের উদ্যোগ। ১১ বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বেতন কাঠামোর কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমে থাকলে নতুন বেতন কাঠামো সেই চাপ কিছুটা কমাতে পারে।
কিন্তু সরকারের জন্য এটি একই সঙ্গে বড় আর্থিক পরীক্ষা।
প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে টেকসইভাবে মেটানো হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ঋণ নিয়ে ব্যয় মেটালে ব্যাংক ও বেসরকারি খাতে চাপ পড়তে পারে। অতিরিক্ত অর্থ সৃষ্টি হলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত করের চাপ দিলে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা বাড়তে পারে।
তাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে—করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পর্যায়ক্রমে পে-স্কেল বাস্তবায়ন।
শেষ কথা
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশ্নটি কেবল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সিদ্ধান্ত।
একদিকে ২৩ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী পরিবারের জীবনযাত্রার মান এবং ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি চাকরিজীবীদের ওপর সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপও বিবেচনায় নিতে হবে।
১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় তাই শুধু ‘কোথা থেকে টাকা আসবে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, টাকা এমনভাবে কোথা থেকে আসবে যাতে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ে, অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়।
সঠিক রাজস্ব সংস্কার, উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন পে-স্কেল অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু অর্থের উৎস যদি মূলত ঋণনির্ভর হয় এবং উৎপাদন ও সরবরাহ একই সঙ্গে না বাড়ে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে আবারও জনগণের কাছ থেকে উঠে আসার ঝুঁকি থাকবে।
তাই নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে শুধু বেতন কত বাড়ল—তা নয়; বরং বেতন বাড়ানোর পরও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা সুরক্ষিত রাখা গেল, সেটিই হবে সরকারের নীতির প্রকৃত পরীক্ষা।


