সরকারি চাকরিতে অফিসে দেরি হলে কি সরাসরি বেতন কাটা যায়? ৩ দিন নয়, বর্তমান বিধিতে যা বলা আছে
সরকারি চাকরিতে অফিসে ৫ মিনিট, ১০ মিনিট কিংবা ১৫ মিনিট দেরি—এ নিয়ে অনেক কর্মচারীর মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, “তিন দিন লেট করলে এক দিনের বেতন কাটা যায়”, আবার কেউ বলেন, “১০ মিনিট পর্যন্ত দেরি মাফযোগ্য”। কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে আসল বিধান কী?
বিষয়টি যাচাই করে দেখা যায়, প্রচলিত এসব কথার সঙ্গে বর্তমান সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধান পুরোপুরি মেলে না। বরং বর্তমান বিধিতে বিলম্বে উপস্থিতির ক্ষেত্রে প্রতি দুই দিনের বিলম্বের জন্য এক দিনের মূল বেতন কর্তনের কথা বলা হয়েছে।
২০১৯ সালের বিধিমালায় আসলে কী আছে?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালে “সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯” জারি করে। এটি এস,আর,ও. নম্বর ৩৮১-আইন/২০১৯ হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
এই বিধিমালার বিধি ৫ সরাসরি বিলম্বে অফিসে উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।
বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া বিলম্বে অফিসে উপস্থিত হতে পারবেন না। আর এই বিধান লঙ্ঘন করলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দিয়ে প্রতি ২ দিনের বিলম্বে উপস্থিতির জন্য ১ দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কর্তন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত “৩ দিন লেট = ১ দিনের বেতন কর্তন” কথাটি বর্তমান ২০১৯ সালের বিধির ভাষা নয়। বিধিতে রয়েছে ২ দিন বিলম্ব = ১ দিনের মূল বেতন।
তাহলে ১ মিনিট দেরি হলেও কি ‘লেট’ হিসেবে গণ্য হবে?
এখানেই বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
বিধি ৫-এ “বিলম্বে উপস্থিতি” বলা হয়েছে এবং এর জন্য কোনো সাধারণ ১০ মিনিটের ছাড় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অফিসের নির্ধারিত সময় যদি সকাল ৯টা হয়, তাহলে ৯টা ১০ মিনিটে উপস্থিত হওয়াকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “১০ মিনিট পর্যন্ত মাফ” হিসেবে গণ্য করার কোনো সাধারণ বিধান ২০১৯ সালের এই বিধিমালায় পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ “১০ মিনিট পর্যন্ত লেট করা যাবে”—এমন কথা সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এ লেখা আছে—এ দাবি সঠিক নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, একজন কর্মচারী একদিন ২ মিনিট বা ৫ মিনিট দেরি করলেই কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো সঙ্গে সঙ্গে এক দিনের বেতন কেটে নিতে পারবেন।
কারণ বিধিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—
১. বিলম্বটি যুক্তিসংগত কারণবিহীন হতে হবে।
২. বেতন কর্তনের আগে কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হবে।
১০ দিন দেরি হলে কি ১০ দিনের বেতন কেটে নেওয়া যাবে?
না—শুধু ১০ দিন লেট হয়েছে বলেই ১০ দিনের বেতন কেটে নেওয়ার বিধান নেই।
বিধি ৫ অনুযায়ী বিলম্বে উপস্থিতির জন্য নির্ধারিত হিসাব হলো প্রতি দুই দিনের বিলম্বে এক দিনের মূল বেতন।
তাই কোনো কর্মচারীর ১০টি বিলম্বের ঘটনা যদি বিধি অনুযায়ী কর্তনযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে শুধু “১০ দিন লেট” হওয়ার কারণে ১০ দিনের মূল বেতন কেটে নেওয়ার সরাসরি বিধান নেই।
এখানে অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি, কারণ, প্রযোজ্য বিধি এবং কর্মচারীর ব্যাখ্যা বিবেচনা করতে হবে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ধরা যাক, কোনো কর্মচারী কয়েকদিন দেরিতে অফিসে এসেছেন। কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন বিলম্বটি বিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়েছে, তাহলে বিষয়টি কেবল হাজিরা খাতায় “Late” লিখে শেষ করার বিষয় নয়।
২০১৯ সালের বিধিমালায় বেতন কর্তনের আগে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
অতএব কোনো কর্মচারী যদি—
- যানজট বা দুর্ঘটনার মতো বাস্তব কারণ দেখান,
- সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে অফিসে নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারেন,
- অফিসের অনুমোদিত কোনো কাজে বাইরে থাকেন,
- ডিজিটাল হাজিরায় কারিগরি সমস্যা হয়ে থাকে,
- হাজিরা দিতে ভুল হলেও বাস্তবে যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত ছিলেন,
- অথবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য কারণ থাকে,
তাহলে কারণ দর্শানোর জবাবে বিষয়গুলো তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ব্যক্তিগত অসুবিধা বা নিয়মিত দেরি হওয়া নিজে থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে “যুক্তিসংগত কারণ” হয়ে যায় না—সেটি কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হবে।
ডিজিটাল হাজিরা দিতে ভুলে গেলে কী হবে?
বর্তমানে অনেক সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা চালু রয়েছে। ফলে একজন কর্মচারী বাস্তবে অফিসে থাকলেও ডিজিটাল হাজিরা না দেওয়ার ঘটনা আলাদাভাবে প্রশাসনিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কর্মচারীর উচিত শুধু মৌখিকভাবে “হাজিরা দিতে ভুলে গেছি” না বলে—
কখন অফিসে প্রবেশ করেছেন, কীভাবে তা প্রমাণ করা যায় এবং কেন ডিজিটাল হাজিরা হয়নি—এসব বিষয় লিখিতভাবে তুলে ধরা।
প্রয়োজনে অফিসের CCTV, প্রবেশ রেজিস্টার, সহকর্মীর সাক্ষ্য, অফিসিয়াল কাজের রেকর্ড বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সহায়ক হতে পারে।
২০২৬ সালেও সময়মতো অফিসে উপস্থিতির ওপর জোর
বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থানের বিষয়ে নতুন করে নির্দেশনা দিয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর ৮৬ নম্বর নির্দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমানে অফিসে সময়মতো উপস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগও অফিসে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি ও অফিস শৃঙ্খলা নিয়ে পৃথক অফিস আদেশ জারি করেছে।
তাহলে প্রশ্নে বর্ণিত কর্মচারীর করণীয় কী?
যদি কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে ১০ দিনের বেতন কর্তনের কথা বলা হয়, তাহলে আবেগের বশবর্তী হয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে তর্কে না গিয়ে প্রথমে লিখিত বিধি ও আদেশের ভিত্তি জানতে চাওয়া বেশি কার্যকর।
বিশেষ করে কর্মচারী যদি ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিয়ে থাকেন, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে—
১. লিখিত কর্তন আদেশ আছে কি না দেখুন
মৌখিকভাবে “বেতন কেটে দেব” বলা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বেতন কর্তনের আদেশ দেওয়া এক বিষয় নয়।
২. কোন বিধির অধীনে কর্তন করা হচ্ছে তা জানতে চান
কর্তন আদেশে কোন বিধি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ১০ দিনের বেতন কেন কাটা হবে—তার হিসাব চান
কারণ ২০১৯ সালের নিয়মিত উপস্থিতি বিধিমালার বিধি ৫-এ বিলম্বের ক্ষেত্রে প্রতি দুই দিনের বিলম্বে এক দিনের মূল বেতন কর্তনের কথা বলা হয়েছে।
৪. কারণ দর্শানোর জবাবের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না দেখুন
কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া বিধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৫. হাজিরার তথ্য সংগ্রহ করুন
কোন দিন কত মিনিট দেরি হয়েছে, কোন দিন ডিজিটাল হাজিরা হয়নি, কোন দিন বাস্তবে অফিসে উপস্থিত ছিলেন—তার একটি তালিকা তৈরি করা উচিত।
৬. অন্য কোনো সরকারি দায়িত্বের কারণে দেরি হলে তার প্রমাণ দিন
শুধু মৌখিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে নথি বা প্রমাণ থাকলে সেটি বেশি কার্যকর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভুলটি কোথায়?
এই আলোচনায় সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে “৩ দিন লেট = ১ দিনের বেতন” কথাটি বর্তমান সরকারি বিধান হিসেবে প্রচার করা।
সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর বিধি ৫ অনুযায়ী প্রতি ২ দিনের বিলম্বে উপস্থিতির জন্য ১ দিনের মূল বেতন কর্তনের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্তনের আগে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
আর “১০ মিনিট পর্যন্ত লেট করা যায়”—এমন সাধারণ ছাড়ও এই বিধিমালায় নেই।
সুতরাং কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়মিত দেরি করলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার অন্যদিকে, নিয়মের বাইরে গিয়ে ইচ্ছামতো বেতন কর্তনেরও সুযোগ নেই। উপস্থিতির তথ্য, বিলম্বের কারণ, কারণ দর্শানোর জবাব এবং প্রযোজ্য বিধি—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সারকথা
সময়মতো অফিসে উপস্থিত হওয়া সরকারি কর্মচারীর বাধ্যবাধকতা। কিন্তু বেতন কর্তনের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করতে হবে।
বর্তমান ২০১৯ সালের বিধিমতে—
বিলম্বে উপস্থিতি → কারণ দর্শানোর সুযোগ → প্রতি ২ দিনের বিলম্বে ১ দিনের মূল বেতন কর্তনের বিধান।
তাই “৩ দিন লেট হলেই ১ দিনের বেতন” এবং “১০ মিনিট পর্যন্ত লেট মাফ”—দুটোকেই সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯-এর সাধারণ বিধান হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না।
কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে ঠিক কত টাকা কর্তন বৈধ হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রযোজ্য অফিস আদেশ, উপস্থিতির রেকর্ড, বিলম্বের কারণ, কারণ দর্শানোর জবাব এবং কর্তন আদেশের ওপর। তাই বাস্তব কোনো বিরোধে লিখিত আদেশটি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ।



